রিয়াদে বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় আরেকজন নিহত, দুই দিনে মোট মৃত্যু দাঁড়াল ১৪ জনে
বিমানবন্দরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে জানায় জোট বাহিনী
সৌদি বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার না করার বিষয়ে আবারও হুথিদের সতর্কতা
শনিবার বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বেড়ে ১৩ জন
হুতিদের হামলার কারণে রোববারও বন্ধ ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার ঠিক এক দিন পর আবার গতকাল রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। ওই হামলায় আরও ১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২ জন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী জানিয়েছে, গতকাল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৪ নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে সেখানে আগুন ধরে যায়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
গতকাল হামলার কারণে চলতি সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। শনিবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন সৌদি নাগরিক এবং অন্যরা বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি জোট জানিয়েছে, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গতকাল কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
আজ সোমবার স্থানীয় সময় ভোরে দক্ষিণাঞ্চলীয় আবহা শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। পরে অবশ্য সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, এখন বিপদ কেটে গেছে।
ইয়েমেনে সৌদি–সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে লিপ্ত হুতিদের ওপর সৌদি আরব যখন বিমান হামলা চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে হুতিদের এসব হামলা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনেছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে গত শনিবারের হামলার পর সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন ওমরাহযাত্রী ইসলামের দুটি পবিত্রতম স্থানে ভ্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে একটি গেটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। উজ্জ্বল কমলা রঙের একটি শিখা দেখে মানুষ আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। মুহূর্তে ছাদের একাংশ ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা ছিল এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
সৌদি কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে ঘোষণা দিয়েছে, রিয়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাসরুমে সশরীর উপস্থিতির বদলে গতকাল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস চালু থাকবে।
অন্যান্য হামলার দায় স্বীকার হুতিদের
গতকাল টেলিভিশন এক ভাষণে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি রিয়াদে শনিবার চালানো হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাঁদের গোষ্ঠীটি সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং সৌদি তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে।
সৌদি সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয় এবং আরামকো মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ গতকাল গভীর রাতে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, ‘বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখা হচ্ছে।’
দাম্মামে রানওয়েতে থাকা একটি ট্যাক্সিং বিমানের প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে তারা পার্ক করা বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজের পাশে টারমাকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে এবং আগুন জ্বলতে দেখেন। প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি উড়োজাহাজ আবার গেটে ফিরে আসে। সেখানে যাত্রীদের নামিয়ে এলাকা ত্যাগ করতে বলা হয়।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪ অনুযায়ী, গতকাল দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর দাম্মামে পৌঁছানো ও ছেড়ে যাওয়ার বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বিলম্বিত ও বাতিল হতে দেখা গেছে।
এর আগে রোববার হুতিরা সৌদি বিমানবন্দর ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাদের সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করে। গোষ্ঠীটি জানায়, ‘আমরা সবাইকে আমাদের সতর্কবার্তা গুরুত্বসহকারে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি; প্রতিহত করার যেকোনো ব্যর্থতার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।’
সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তাদের দেশের নাগরিকদের জেদ্দা, দাম্মাম এবং মদিনা বিমানবন্দর ছাড়া বাকি সব বিমানবন্দরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদিতে বা সৌদির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বনের নোটিশ জারি করেছে।
আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসছে: হুথিদের হুঁশিয়ারি
গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকা দখলের পর সৌদি আরব ইয়েমেনে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে, হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে এবং দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে পাল্টা অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে।
হুতিরা গতকাল জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ১২৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের হুতি–নিয়ন্ত্রিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘আল মাসিরাহ’ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বিবৃতিতে বলেছে, সৌদি শত্রুরা ইয়েমেনে তাদের আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না করলে আল্লাহ চাইলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তারই অংশ হিসেবে এই সংঘাতের বিস্তার ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রও হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির হামলায় যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।
টেলিগ্রামে এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তিনি তাঁর সৌদি প্রতিপক্ষকে জানিয়েছেন, তেহরান সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে সহায়তায় প্রস্তুত।