বিধ্বস্ত হওয়া মার্কিন কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজের কাজ কী, দাম কত

একটি বোয়িং কেসি–১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার উড়োজাহাজ থেকে জ্বালানি নিচ্ছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর একটি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানফাইল ছবি: এএফপি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে ইরাকের আকাশসীমায় একটি মার্কিন কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ইরান যুদ্ধ তদারকি করছে মার্কিন বাহিনীর এই কমান্ড।

সেন্টকমের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড একটি মার্কিন কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়ে অবগত। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন বন্ধুপ্রতিম আকাশসীমায় এই ঘটনা ঘটে এবং বর্তমানে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় দুটি উড়োজাহাজ যুক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি উড়োজাহাজ পশ্চিম ইরাকে বিধ্বস্ত হয়। দ্বিতীয়টি নিরাপদে অবতরণ করেছে।

বিবৃতিতে সেন্টকম দাবি করেছে, শত্রুপক্ষের হামলা কিংবা ভুলবশত নিজেদের বাহিনীর (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) হামলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেনি।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটিতে ছয়জন আরোহী ছিলেন।

উড়োজাহাজটি ঠিক কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মাঝ আকাশে দুটি বিমানের মধ্যে সংঘর্ষের একটি সম্ভাবনা রয়েছে।

চলমান ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই সময় সেন্টকম জানিয়েছিল, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ভুলবশত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমানগুলো ভূপাতিত করা হয়। এই যুদ্ধবিমানগুলোর ছয়জন ক্রুই নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছেন।

কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজের কাজ কী

যুদ্ধক্ষেত্রে এই ট্যাংকার উড়োজাহাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লক্ষ্যবস্তু অনেক দূরে হলে যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমানগুলোকে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করে এগুলো সচল রাখে। এটি মূলত একটি বিশাল লজিস্টিক অপারেশন, যেখানে একই সময়ে আকাশে থাকা অনেকগুলো যুদ্ধবিমানের জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে।

জ্বালানি নেওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। ট্যাংকার উড়োজাহাজ থেকে একটি ‘প্রোব’ বা নল বের করে নিচে নামিয়ে দেওয়ার আগে অন্য যুদ্ধবিমানটি বা বোমারু বিমানটিকে ট্যাংকারের খুব কাছ দিয়ে উড়তে হয়। গ্রহীতা যুদ্ধবিমানের পাইলট তখন প্রোবের দিকে এগিয়ে যান এবং ট্যাংকারের নিচের আলোকসংকেত অনুসরণ করে নিজের অবস্থান এমনভাবে সমন্বয় করেন যাতে প্রোবটি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পর জ্বালানি স্থানান্তরের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। পুরোটা সময় যুদ্ধবিমানটি বড় ট্যাংকার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে অবস্থান করে—যা প্রায়শই রাতের আঁধারে করা হয়।

আশপাশে আরও অনেক যুদ্ধবিমান থাকার পরিবেশে প্রোব কিংবা ‘শাটলকক আকৃতির ‘ড্রগ’-এর সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা পাইলটের জন্য অত্যন্ত মুনশিয়ানার কাজ। শত্রুর নজর এড়াতে অনেক সময় জ্বালানি নেওয়ার এই মিশনের সময় উড়োজাহাজের সব আলো নেভানো থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ঘটনাটি ইরাকের আকাশে ঘটেছে। তবে প্রতিবেশী দেশ ইরান থেকে এর দূরত্ব ঠিক কতটুকু ছিল তা এখনো জানা যায়নি।

সাধারণত একটি কেসি-১৩৫ বিমানে তিনজন ক্রু থাকেন—একজন পাইলট, একজন কো-পাইলট এবং একজন বুম অপারেটর। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্যমতে, এয়ার মোবিলিটি কমান্ডের বহরে এ ধরনের প্রায় ৪০০টি ট্যাংকার বিমান রয়েছে।

কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজের দাম কত

দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মিশনে মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ হলো বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার। এর প্রধান কাজ হলো আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ করা। এর ফলে যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান এবং নজরদারি উড়োজাহাজগুলো উড্ডয়নরত অবস্থাতেই জ্বালানি গ্রহণ করতে পারে। এই সক্ষমতার কারণে সামরিক উড়োজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলো অবতরণ না করেই দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে পারে এবং তাদের অভিযানের পরিধিও অনেক বেড়ে যায়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস নাও-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই উড়োজাহাজ মার্কিন বিমানবাহিনীর আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বৈশ্বিক সামরিক অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে।

দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ অর্থবছরের স্থির ডলারের হিসাবে প্রতিটি কেসি-১৩৫ উড়োজাহাজের উৎপাদন খরচ প্রায় ৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। উড়োজাহাজটি তৈরি করে বোয়িং কোম্পানি। অবশ্য বর্তমানে নতুন করে আর তৈরি না করে এসব উড়োজাহাজকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে।