মার্কিন অবরোধে তেল রপ্তানি বন্ধ থাকলেও কত দিন ইরানের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না

  • মার্কিন অবরোধের কারণে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ইরান তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে।

  • ইরানের তেলের মজুতসুবিধা কতটা আছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

  • ইরানের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোতে এখনো প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে।

ওমানের মুসান্দাম সীমান্তের কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল-খাইমাহ থেকে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থানরত কার্গো জাহাজ দেখা যাচ্ছে। ১১ মার্চ ২০২৬, পারস্য উপসাগরছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। তবে ইরানের বন্দরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার পর বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেল উৎপাদন কমিয়ে টানা দুই মাস রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখলেও ইরানের অর্থনীতিতে খুব বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। দুই মাস তেল রপ্তানি বন্ধের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে ইরান।

এই অবরোধের কারণে ইরানের প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রধান ক্রেতা চীনের কাছে সরবরাহ করা বিঘ্নিত হতে পারে।

ইরানের তেল উৎপাদন বন্ধ হলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে বিঘ্নিত হওয়া ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল সরবরাহের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হবে। এতে বাজার আরও সংকুচিত হবে এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে।

রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরান এখন তাদের অপরিশোধিত তেল স্থলভাগের স্টোরেজ ট্যাঙ্কগুলোতে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। একবার এই ট্যাঙ্কগুলো পূর্ণ হয়ে গেলে, ওপেকের এই সদস্য দেশটিকে বাধ্য হয়েই তেলের মূল উৎপাদন কমিয়ে দিতে হবে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এফজিই নেক্সট্যান্ট ইসিএ’–এর অনুমান হচ্ছে, ইরানের স্থলভাগে মোট ১২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল রাখার ক্ষমতা রয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে ৯ কোটি ব্যারেল খালি বা ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে।

এফজিই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘রপ্তানি ছাড়া ইরান সাধারণ সময়ের মতো দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন প্রায় দুই মাস পর্যন্ত বজায় রাখতে পারবে। আর উৎপাদন দৈনিক ৫ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিলে এই সময়কাল তিন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।’

ওই প্রতিবেদনে আরও যোগ করা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইরানি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ‘এনার্জি অ্যাসপেক্টস’ নামক প্রতিষ্ঠান কাইরোসের তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করছে, ইরানের স্থলভাগে তেল মজুতের সক্ষমতা আরও অনেক কম, মাত্র তিন কোটি ব্যারেল।

এই হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ থাকলে স্টোরেজ পূর্ণ হওয়ার আগে ইরান মাত্র ১৬ দিন বর্তমান উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে।

এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, ‘এপ্রিল মাসের চলমান মার্কিন অবরোধ ইরানের উৎপাদনের ওপর বড় কোনো প্রভাব নাও ফেলতে পারে। তবে এটি মে মাস পর্যন্ত চলতে থাকলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে।’

ব্রোঞ্জ বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান মনে করে, ইরান তাদের নথিবদ্ধ পূর্ণ মজুতক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে না। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের মে মাসে তেলের মজুত সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল, যা সম্ভবত তাদের ধারণক্ষমতার বাস্তবসম্মত সীমা।

ব্রোঞ্জ আরও বলেন, ইরান উৎপাদন কমানোর প্রক্রিয়াকে আরও দেরি করতে তাদের বন্দরে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে ভাসমান স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করছে, অবরোধের আওতায় আরও অনেক জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের মালিকানাধীন ট্যাঙ্কার ‘রিচ স্টারি’, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে। গতকাল বুধবার সেটিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার ইরানের বন্দরের ওপর অবরোধ শুরুর পর থেকে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আটটি তেলের ট্যাঙ্কার আটকে দেওয়া হয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ওমান উপসাগরের চাবাহার বন্দর থেকে বের হওয়ার চেষ্টার সময় একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার দুটি ট্যাঙ্কারকে থামিয়ে দিয়েছে।