ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ছে, বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ

তেহরানের বাজারে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়েনছবি: এএফপি
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

ইরানে আরও বেশি করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হলেও দেশটির বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে। ইরানে ক্রমেই অবনতির দিকে থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঠেকাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না বিক্ষোভকারীরা।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার রাতে কেন্দ্রীয় প্রদেশ ইলামে অবস্থিত আবদানান শহরে বড় আকারে বিক্ষোভ হয়েছে। ছোট এ শহরে গত সপ্তাহে কয়েকটি বড় বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে।

গতকাল আবদানান শহরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষকে জড়ো হতে দেখা যায়। মা-বা এবং বয়স্ক স্বজনদের সঙ্গে ছোট শিশুদেরও বিক্ষোভে শামিল হতে দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীরা হাঁটছিল আর নানা স্লোগান দিচ্ছিল। ওই সময় তাদের মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার টহল দিচ্ছিল। বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা যে নিরাপত্তা বাহিনীর তুলনায় বহুগুণ বেশি ছিল, তা স্পষ্ট দেখা গেছে।

ইলাম প্রদেশের রাজধানী ইলাম নগরীতে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী ইমাম খোমেনি হাসপাতালে ঢুকে বিক্ষোভকারীদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। এটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ কীভাবে ভিন্নমত দমন করতে প্রস্তুত থাকে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মালেকশাহি এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটির প্রবেশমুখে জড়ো হওয়া কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আহত কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অনলাইনে প্রচারিত কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মানুষকে গুলি করা হচ্ছে এবং তারা পালানোর সময় মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় গভর্নর বলেছেন, এই গুলির ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে।

রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গুলিতে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গতকাল মঙ্গলবার তারা বলেছে, মৃত বিক্ষোভকারীদের জানাজা শেষ হওয়ার পর সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

তেহরানে ধারণ করা অনেক ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ী ও দোকানিরা তাঁদের দোকান বন্ধ করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন। সেখানে লাঠিপেটা করা হয়েছে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করা হয়েছে।

বাজারের ভেতরে মানুষকে ‘স্বাধীনতা’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশেও তাঁরা বিভিন্ন কথা বলতে থাকেন। নিরাপত্তা বাহিনীর বাধার মুখে পড়লে এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘চাইলে আমাকে ফাঁসি দিন, আমি দাঙ্গাবাজ নই।’ তাঁর কথা শুনে ভিড়ের মধ্য থেকে উল্লাস প্রকাশ করা হয় এবং হাততালি দিয়ে সমর্থন জানানো হয়।

চলতি সপ্তাহে বিক্ষোভ নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, দাঙ্গাবাজদের উপযুক্ত জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া দরকার।

ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই বলেছেন, ‘এবার দাঙ্গাবাজদের প্রতি আমরা কোনো দয়া দেখাব না।’

মূলত গত ২৮ ডিসেম্বর দোকানদারদের আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ উত্তেজনার রেশ আশপাশের রাস্তাঘাট ও পাড়াগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল মঙ্গলবার ইয়াফতাবাদসহ তেহরানের আরও কয়েকটি বড় বাজারেও বিশাল ধর্মঘট ও বিক্ষোভ দেখা গেছে। ইয়াফতাবাদে পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়েছিল: ‘গাজা নয়, লেবানন নয়; আমার জীবন ইরানের জন্য নিবেদিত।’

ইরান সরকারের বিরুদ্ধে গাজা ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।

তেহরানে অবস্থিত সিনা হাসপাতালের আশপাশে আরও বেশ কিছু সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্স এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, হাসপাতালের প্রাঙ্গণের ভেতরে কাঁদানে গ্যাসের যে শেলগুলো পড়ে থাকতে দেখা গেছে, সেগুলো নিরাপত্তা বাহিনী ছোড়েনি।

পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা লোরেস্তান ও কেরমানশাহ, উত্তর-পূর্বের মাশহাদ, রাজধানীর দক্ষিণে কাজভিন, চাহারমহালের শহর শাহরেকোর্দ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের বাখতিয়ারি এবং হামেদান নগরীতেও বিক্ষোভ হয়েছে। হামেদান নগরীতে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে এক নারী পুলিশের জলকামানের মুখোমুখি হয়েও সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।

ইরানে ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতাকারী একটি বিদেশি মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা দাবি করেছে, এ পর্যন্ত বিক্ষোভে অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। ইরান সরকার অবশ্য কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। আর আল-জাজিরাও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ইরানে এখনো বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি অবস্থা চলছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে।

ইরানের সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার বলেছে, তারা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তবে পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে।

সম্প্রতি ইরানে খাবারের তেলের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। দাম প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ইরানি জনগণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০১৮ সালের পর থেকে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন