যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় ইরান ও লেবাননে বাস্তুচ্যুত ৪০ লাখ মানুষ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে এ পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান সরকার এখনো প্রকৃত সংখ্যার তথ্য প্রকাশ করেনি।
ভয়াবহ এই যুদ্ধের কারণে ইরানের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এটি ইরানের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও বেশি।
যুদ্ধ ২৮ দিন গড়িয়েছে। প্রাণভয়ে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে শুরু করায় বড় ধরনের শরণার্থী সংকটের আশঙ্কায় রয়েছে ত্রাণ সংস্থা ও ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো। বেসামরিক লোকজন সহিংসতা থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন।
তবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মানুষের যাতায়াত এখনো সীমিত এবং তা মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও স্বল্পমেয়াদি। আফগান সীমান্ত দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করছেন, তাঁরা মূলত ইরান থেকে ফিরে আসা শরণার্থী। পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো শরণার্থী প্রবেশের তথ্য মেলেনি; কেবল অনুমোদিত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরাই যাতায়াত করছেন।
শুধু ইরান নয়, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার যে নির্দেশ দিয়েছে, তার পরিধি এখন আরও বাড়ানো হয়েছে। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে লিটানি নদী ছাড়িয়ে এখন জাহরানি নদীর উত্তর দিক পর্যন্ত এই উচ্ছেদ আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান ও আজারবাইজান সীমান্ত এখন পর্যন্ত শান্ত রয়েছে। এসব সীমান্ত দিয়ে কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিরাই যাতায়াত করছেন। তবে মাঝেমধ্যে এসব সীমান্ত ব্যবহার করে বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধার বা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সংকটময় পরিস্থিতিতে ৩২৫ জন ইরানি নাগরিক সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ইরাক থেকে কিছু মানুষ ইরানে নিজ দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। একের পর এক হামলার কারণে ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়; সাধারণ মানুষ তাঁদের বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি হাসপাতাল, পারমাণবিক স্থাপনা, তেল শোধনাগার ও সুপেয় পানির প্ল্যান্টেও হামলা চালানো হয়েছে।
মানুষের ঘর ছাড়ার হার এখন দেশটির আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অনেক পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে রাস্তা, যানবাহন বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। অনেকের জন্য এটিই প্রথম বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা নয়। গত দুই সপ্তাহে আড়াই লাখের বেশি মানুষ লেবানন ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহের তুলনায় দেশ ছাড়ার এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অভ্যন্তরে মানবিক সংকট তীব্র হচ্ছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৮৫ হাজার ১৭৬টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৬০০টি স্কুল ও প্রায় ৬৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। শুধু রাজধানী তেহরানেই প্রায় ১৪ হাজার আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব ভবনের অন্তত ৬ হাজার মানুষকে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি হোটেলে রাখা হয়েছে।
লেবাননে বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি মানুষ
শুধু ইরান নয়, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার যে নির্দেশ দিয়েছে, তার পরিধি এখন আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে লিটানি নদী ছাড়িয়ে এখন জাহরানি নদীর উত্তর দিক পর্যন্ত এই উচ্ছেদ আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই ঢালাও উচ্ছেদ আদেশের কবলে পড়েছে লেবাননের ১ হাজার ৪৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এটি দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এমন নির্দেশের কারণে এখন পর্যন্ত লেবাননের ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রামের মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনী এখন দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় তাদের দখলদারি আরও বাড়াচ্ছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সেখানে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়।
গত দুই সপ্তাহে লেবাননের প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন—অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ মানুষই ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, দেশটিতে নিবন্ধিত বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখন ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৮। এর মধ্যে ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৪২ জন বিভিন্ন গণ-আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।
মানুষের ঘর ছাড়ার হার এখন দেশটির আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অনেক পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে রাস্তা, যানবাহন বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। অনেকে এবারই প্রথম বাস্তুচ্যুত হননি। গত দুই সপ্তাহে আড়াই লাখের বেশি মানুষ লেবানন ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহের তুলনায় দেশ ছাড়ার এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
লেবানন ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষের বড় অংশই আশ্রয় নিচ্ছেন পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়ায়। ১৭ মার্চ পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ সিরিয়ায় প্রবেশ করেছেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ব্যক্তিদের সিংহভাগ সিরীয় নাগরিক হলেও এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার লেবানিজও রয়েছেন।
বিচ্ছিন্ন দক্ষিণ লেবানন
দক্ষিণ লেবাননকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা সবকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লিটানি নদীর ওপর নির্মিত এসব সেতুর মধ্যে রয়েছে—কাসমিয়েহ, কোস্টাল হাইওয়ে, আল-কান্তারা, খারদালি, আল-দালাফা এবং জারাইয়া-তির্সেফ্লাই সেতু।
আল-জাজিরার যাচাইকৃত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রতিটি সেতু সুনির্দিষ্টভাবে বোমা মেরে ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে সেগুলো আর ব্যবহারের উপযোগী না থাকে। অথচ দক্ষিণ লেবাননের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই সেতুগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, লিটানি নদীর ওপর থাকা সব পারাপার এবং দুই দেশের সীমান্ত–সংলগ্ন ঘরবাড়ি যেন ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মূলত এই লিটানি নদীসংলগ্ন এলাকাগুলো থেকেই গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ লাখ মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই ধ্বংসযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সেতুগুলো ধ্বংস করার অর্থ হলো দক্ষিণ লিটানি অঞ্চলের সঙ্গে লেবাননের মূল ভূখণ্ডের ভৌগোলিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।’