ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি কোথায়, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি গোয়েন্দারা কী দাবি করছেন

মোজতবা খামেনিছবি: এক্স থেকে সংগৃহীত

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে অচেতন অবস্থায় পবিত্র নগরী কোমে চিকিৎসাধীন আছেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক গোয়েন্দা নথির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস। নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তিনি এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম নন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের প্রথম দিন বিমান হামলায় মোজতবার বাবা ও ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরেকটি হামলায় ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হন বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ওই নথি যুক্তরাজ্যের দৈনিক দ্য টাইমস হাতে পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। নথিতে দাবি করা হয়, প্রথমবারের মতো মার্কিন–ইসরায়েলি গোয়েন্দারা মোজতবার অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছেন। তেহরান থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে শিয়াদের অন্যতম পবিত্র শহর কোমে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

গোয়েন্দা নথিতে দাবি করা হয়েছে, মোজতবা খামেনি কোমে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং শাসনব্যবস্থার কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে তিনি এখন সম্পূর্ণ অক্ষম।

একই নথিতে দাবি করা হয়েছে, শিয়া ধর্মীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোমেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেখানে একটি বড় আকারের মাজার নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শনাক্ত করেছে। সেখানে একাধিক কবরের স্থান রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—সম্ভবত আলী খামেনির পাশে পরিবারের অন্য সদস্যদের, এমনকি মোজতবাকেও দাফন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনিকে তাঁর জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে দাফন করা হবে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সে পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নথিতে দাবি করা হয়, গত মার্চের শুরুতে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর থেকে মোজতবাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি, তাঁর কোনো বক্তব্যও শোনা যায়নি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর নামে মাত্র দুটি বিবৃতি পাঠ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা নথিতে আরও দাবি করা হয়, এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে একটি ওয়ার রুমে বসে ইসরায়েলের ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রের মানচিত্র বিশ্লেষণ করতে দেখানো হয়। তবে ভিডিওতে তাঁর নিজের কণ্ঠস্বর না থাকায় তিনি কোমায় আছেন—এই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, তিনি হাসপাতালে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় আছেন। কারও কারও মতে, হামলায় তাঁর পা ভেঙে গেছে এবং মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বোচ্চ নেতার এই শারীরিক অক্ষমতা ইরানের শাসনব্যবস্থাকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশটিতে সর্বোচ্চ নেতাই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্লেষকদের ধারণা, শক্তিশালী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন কার্যত দেশ পরিচালনা করছে এবং মোজতবা কেবল আনুষ্ঠানিক নেতার ভূমিকায় রয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে কোনো আলোচনা বা চুক্তি হচ্ছে না।

আগামীকাল বুধবার আলী খামেনির মৃত্যুর ৪০তম দিন পূর্ণ হবে। শিয়া ঐতিহ্য অনুযায়ী, এটি শোক পালনের সমাপনী পর্ব। মৃত্যুর পরপরই দাফনের রেওয়াজ থাকলেও ইরান সরকার তা পিছিয়ে দিয়েছে। সরকারি ব্যাখ্যা—নজিরবিহীন জনসমাগমের আশঙ্কাই এর মূল কারণ।

আরও পড়ুন

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দাফন অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি এড়াতেই পুরো প্রক্রিয়াটি চরম গোপনীয়তায় সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির দাফনের সময় যে অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা হয়েছিল, এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায় তেহরান।

আরও পড়ুন