হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত বেড়েছে, ভারত অভিমুখী জাহাজে হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা না থামালে জ্বালানি পরিবহনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এ ঘোষণার ফলে প্রণালিটি ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। জলপথটি ঘিরে বেড়েছে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রাও। এতে করে বিশ্বে ইতিমধ্যে অস্থিতিশীল থাকা জ্বালানি তেলের বাজার ও শেয়ারবাজার আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। এ ছাড়া বুধবার ইরানের ১৬টি নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের ভাষ্য, সেগুলো হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের কাজে যুক্ত ছিল। প্রণালিটি বন্ধ করা হলে ইরানে হামলা আরও ‘২০ গুণ’ জোরদার করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।
হরমুজ প্রণালির উত্তরে রয়েছে ইরান। দক্ষিণে ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হিসাবে, ২০২৫ সালে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়।
হরমুজে তিন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য কারা দায়ী, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরসিজি) বুধবার জানিয়েছে, এই জলপথে চলাচলে তাদের সতর্কতা না মানায় দুটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তারা। জাহাজ দুটি ইসরায়েলের মালিকানাধীন। এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী।
হরমুজ ঘিরে সংঘাতের মধ্যে বুধবার যুদ্ধের ১২তম দিনেও ইরান ও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানে সবচেয়ে তীব্র হামলা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। এতে ইরানে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। গতকাল আইআরজিসিও বলেছে যে যুদ্ধের মধ্যে তারা এখন ‘সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী’ হামলা শুরু করেছে।
ইরানের পাশাপাশি লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বেসামরিক স্থাপনায় হামলা না চালানোর জন্য যুদ্ধের পক্ষগুলোকে আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের ১৬ নৌযান ধ্বংস
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ। এরই মধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যম সিবিএস জানায়, এই জলপথে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। এরপরই মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, হরমুজে যদি ইরান মাইন স্থাপন করে, তাহলে এ পরিণতি এমন হবে, যা কেউ কখনো দেখেনি।
ট্রাম্পের এমন হুমকির মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের ‘মাইন স্থাপনকারী’ ১৬টি নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। নৌযানগুলোয় হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে তারা। পরে রাতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের নৌবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার ও নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধ শুরুর দিনই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেদিন হামলায় তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি আহত হন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে ইসরায়েলি সূত্র।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব উপসাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে ১৩টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। এর মধ্যে তিনটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে হরমুজে। এই প্রণালিতে সর্বশেষ জাহাজটিতে হামলা হয় বুধবার সকালে। থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ওই জাহাজ থেকে অন্তত ২০ নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনজন নিখোঁজ।
জাহাজটি ভারতের কান্দলা বন্দরে যাচ্ছিল। এক বিবৃতিতে জাহাজটিতে হামলার নিন্দা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তেল ছাড়ের অনুমতি দিল আইইএ
হরমুজ প্রণালির উত্তরে রয়েছে ইরান। দক্ষিণে ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হিসাবে, ২০২৫ সালে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়, যার বার্ষিক বাণিজ্যমূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। হরমুজ দিয়ে শুধু ইরান নয়; ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত তাদের জ্বালানি তেল রপ্তানি করে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ থাকায় গত সোমবার ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১২০ ডলার হয়। ২০২২ সালের পর এটি সর্বোচ্চ। গত দুই দিন ধরে ৯০ ডলারের আশপাশে রয়েছে। এই দাম যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের খাতাম আল–আনবিয়া সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি। তিনি বলেন, তেলের দাম ২০০ ডলার হওয়ার প্রস্তুতি নিন।
যদিও কিছুটা স্বস্তির আশা দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। গতকাল সংস্থাটি ঘোষণা দিয়েছে, বৈশ্বিক কৌশলগত তেলের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ের অনুমতি দিয়েছে তারা। তেলের দাম কমানোর জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইইএর ৩২ সদস্যের দেশগুলোর কাছে বর্তমানে ১২০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল জরুরি ভিত্তিতে মজুত করা রয়েছে।
ইরানে ২০৬ শিক্ষক–শিক্ষার্থী নিহত
মঙ্গলবার রাতে তেহরানের অনেক স্থানে তুষারপাত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় শহরটিতে যে দূষণ সৃষ্টি হয়েছিল, তা তুষারপাতে কিছুটা কমেছে। তবে হামলা কমেনি। বুধবারও বোমায় কেঁপে উঠেছে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল। তেহরানের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, ‘ঘুমানোর সময় নির্ভর করে বোমাবর্ষণের ওপর। হামলা কমলে ভোরে ঘুমাতে যাই। দুপুরে উঠি।’
যুদ্ধের সময় হামলায় ইরানে হাসপাতাল, স্কুল, বাসাবাড়িসহ প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট। এর মধ্যে ৭৭টি চিকিৎসাকেন্দ্র ও ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর ইরানের গণমাধ্যমের তথ্যমতে, একই সময়ে ইরানে ২০৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে দেশটিতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ।
বুধবার লেবাননের বৈরুত, হাবুশ, আল–সাওয়ানাসহ বিভিন্ন শহরেও ইসরায়েলের হামলায় ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে যুদ্ধ চলাকালে লেবাননে অন্তত ৫৭০ জনের প্রাণহানি হলো। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৪৪ জন। এ ছাড়া গতকাল ওমান, আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে হামলার কথা জানিয়েছে ইরান। এর মধ্যে কাতার ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা হয়।
এরই মধ্যে নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে ইরানের আইআরজিসি। তারা বলেছে, এখন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ‘অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংক’ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম, এনভিডিয়া, ওরাকলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত করবে তারা।
‘নিরাপদে’ আছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা
যুদ্ধ শুরুর দিনই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সেদিন হামলায় তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি আহত হন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে ইসরায়েলি সূত্র। পরে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তাঁর আহত হওয়ার খবর স্বীকার করে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি ‘নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।’
খামেনি ছাড়াও চলমান যুদ্ধে ইরানের প্রায় অর্ধশত শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন বলে দাবি ওয়াশিংটনের। এসব প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলে মনে করেন দেশটির গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডিপ্লোহাউসের পরিচালক হামিদ রেজা গোলামজাদে। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান আগেই বলেছিল, তাদের ওপর হামলা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তখন তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়নি। এখন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বকে ভুগতে হচ্ছে। ইরানের নিরাপত্তা দিলে যে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি নিরাপদে থাকবে, তা সবার বোঝা প্রয়োজন।