শান্তিচুক্তির ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের, যুদ্ধে বিজয় দাবি তেহরানের
ইরান যুদ্ধ ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা অবশেষে কাটতে যাচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে রোববার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এতে সই করতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটন। পশ্চিমা একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সমঝোতা স্মারকে এখনো পরিবর্তন আসা সম্ভব। তবে সম্ভাব্য চুক্তিতে এটা স্পষ্ট যে এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাঁর দেশ আরও শক্তিশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী,’ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন আব্বাস আরাগচি।
চুক্তিসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর অজুহাত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যে কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সমঝোতা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, এই চুক্তিতে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত হচ্ছে এবং তা সমঝোতা আলোচনা ‘খুব, খুব ভালো একটি জায়গায় নিয়ে এসেছে’।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরুর পর সম্প্রতি আবার একে অন্যের ওপর হামলা চালায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার রাতেও ইরানে কঠোর হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে কিছুক্ষণ বাদেই আবার বলেন, তিনি হামলা চালাতে নিষেধ করেছেন। কারণ, দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি প্রস্তুত। এরপরই সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি সামনে আসে।
শুধু সূত্র নয়, চলতি সপ্তাহান্তে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারাও। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রায়ান জিনকের ভাষ্যমতে, যেকোনো সময়ের তুলনায় একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ট্রাম্প আবার আরাগচির সেই কথা শেয়ার করেছেন।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার সম্ভাবনা এখন প্রবল। এই সমঝোতা স্মারকটি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা হচ্ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্মারকটিতে দুই পক্ষ সই করলে ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এ সময়ে চূড়ান্ত একটি চুক্তির আলোচনা হবে। যদিও এত দিন নানা ইস্যুতে জটিলতার কারণে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করার করার বিষয়টি আটকে ছিল।
এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা হলে তা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য বড় অর্জন হবে বলে উল্লেখ করেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অস্ট্রিয়ার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা উল্ফগ্যাং পুসতাই। তবে তাঁর মতে, কোনো সমঝোতা আসলেই হবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। কারণ, ইসরায়েল এখনো দক্ষিণ লেবাননে বোমাবর্ষণ ও দখলদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধ বন্ধে ইরান কী চায়
সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়টি আলোচনায় এলেও ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো দেশই দিনক্ষণ বা স্থান নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি। তবে সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের মধ্যেই স্মারকের বিভিন্ন শর্ত চূড়ান্ত করবে তেহরান ও ওয়াশিংটন। রোববার এই স্মারকে সই করতে পারেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
সমঝোতা স্মারকে ইরানের বিভিন্ন শর্তের কথা তুলে ধরেছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধে আগের শর্তগুলো থেকে তেমন একটা সরে আসেনি তেহরান। ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় দাবিটি হলো, লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে নিতে হবে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি থাকবে। বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলার ছাড়ের কথাও তোলা হবে। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় ইরানে ৩০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানে এ ক্ষতি সামলে নিতে একটি পরিকল্পনা জমা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্রদের।
ইসরায়েলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। পরে ২ মার্চ লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলা চালায়। সেদিন থেকেই লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবারও হামলা হয়েছে। লেবাননে হামলা চললে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্ভব নয় বলে আগে থেকেই জানিয়ে আসছিল তেহরান।
সমঝোতা স্মারকেও একই শর্ত রাখছে ইরান। তবে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইল কোহেনের ভাষ্য, ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলো আমলে না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করলে তাঁরা কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না। আর ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি মাথায় রেখে ট্রাম্পকে চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তবে ইসরায়েল যা-ই বলুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর দেশটির বড় নির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে ট্রাম্প ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বললে তা দেশটিকে মানতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অন্যদিকে লেবাননে হামলা বন্ধ করলে নিজ দেশে নেতানিয়াহুর জনসমর্থন কমতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনে।
ট্রাম্পের ‘মুখরক্ষার’ সুযোগ
ইরান যুদ্ধ না থামাতে পারলে বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ব্যাপক হারে কমেছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা। জনপ্রিয়তার এই হার নিয়ে তিনি আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন। এ ছাড়া যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিভিন্ন মিত্রদেশ থেকেও ট্রাম্পের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এখন সমঝোতা স্মারকে ইরানের বিভিন্ন শর্তের কথা জানা গেলেও, যুক্তরাষ্ট্র কিছু সামনে আনেনি। আর ইরানের শর্তগুলো দেখে মনে হচ্ছে, সমঝোতা স্মারক থেকে খুব কম অর্জন করতে পারবেন ট্রাম্প। এরই মধ্যে সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত প্রকাশ করায় ইরানের ওপর চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রকাশিত তথ্যগুলো সত্য নয় বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বড় কোনো অর্জন না হোক, এই সমঝোতা স্মারকে সই ট্রাম্পের জন্য ‘মুখরক্ষার’ সুযোগ বলে মনে করছেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের শিক্ষক আন্দ্রিয়া দেসি। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে বের হতে একটি সমঝোতার পথ খুঁজতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত একটা চুক্তি তাঁর মুখরক্ষা করবে।