যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঠিক আগের মুহূর্তগুলোতে কী হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত বুধবার যুদ্ধবিরতি হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছিল। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই যদ্ধ বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমবর্ধমান হারে ধ্বংসাত্মক হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার মধ্যে গণহত্যার শামিল হুমকিও ছিল। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার রাত ৮টার (গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত) মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার সময়সীমা তেহরান না মানলে ‘পুরো একটি সভ্যতা’ শেষ হয়ে যাবে। এ সময় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অনেক অশ্লীল শব্দও ব্যবহার করেন।
এর এক দিন আগে ট্রাম্প ইরানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন।
বিশ্বনেতারা ট্রাম্পের এমন ভাষায় আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন, বিশ্ববাজারে ধস নেমেছে এবং এমনকি হোয়াইট হাউস পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছে কি না, কেউ কেউ তা নিয়েও চিন্তা শুরু করেছেন।
অবশেষে উত্তেজনাপূর্ণ মঙ্গলবারের পরিক্রমায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শেষ মুহূর্তের কূটনীতি সফল হয়। ইরানের ওপর বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার ৯০ মিনিটের কম সময় আগে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত হয়। ইসরায়েলও তাদের হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। তবে তারা দাবি করেছে, লেবানন এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়।
উভয় পক্ষ সব ধরনের হামলা বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হওয়ার পর এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আবার আলোচনা শুরু করতে আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠক শুরুর কথা রয়েছে।
গত বুধবার নিজের মালাকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক ‘স্বর্ণযুগ’ নিয়ে আসতে পারে।
তবে ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবারজুড়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্ব এক চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। একদিকে হুমকি-পাল্টা হুমকি ও উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বাড়ছিল, অন্যদিকে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছিল পুরোদমে।
শেষ পর্যন্ত আলোচনা নাকি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ—কোনটি জয়ী হবে, তা ছিল অনিশ্চিত। এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আগের উত্তেজনাকর মুহূর্তগুলোর মূল ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো—
গ্রিনিচমান সময় (জিএমটি) মঙ্গলবার দুপুর ১২:০৬—ইরানের সভ্যতার প্রতি ট্রাম্পের হুমকি
মঙ্গলবার সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ওয়াশিংটন ইরানের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোয় বিধ্বংসী হামলা চালাবে।
ট্রাম্প এমনকি এমন ঘোষণাও দেন, ‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতার মৃত্যু হবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না’—এমন একটি বক্তব্য যেটিকে আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ‘গণহত্যার’ হুমকির শামিল বলে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের সামরিক শক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী এমন এক পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হবে...ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে পড়বে, জ্বলবে, বিস্ফোরিত হবে এবং সেগুলো আর কখনোই ব্যবহারের উপযোগী থাকবে না।’
মঙ্গলবার বিকেল ৩:২১—ইরানের খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মেহের নিউজ এজেন্সি খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে। ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলো এই দ্বীপেই অবস্থিত। সংস্থাটি আরও জানায়, সেখানকার অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল ৩:৪০—হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে চীন ও রাশিয়া বাহরাইনের একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেয়। ওই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় রাষ্ট্রগুলোকে সমন্বিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও দুটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। অন্য দুটি দেশ—চীন ও রাশিয়া প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্ষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে এই দুই দেশের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
মস্কো ও বেইজিং যুক্তি দেয়, খসড়া প্রস্তাবটি একপেশে এবং তেহরানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, সেই মুহূর্তে এই প্রস্তাব নিয়ে এগোলে তা ভুল বার্তা পৌঁছে দিত।
মঙ্গলবার বিকেল ৪:৫৪—কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চ সতর্কতা জারি
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা দেশটিকে লক্ষ্য করে চালানো একটি ‘ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সফলভাবে প্রতিহত’ করেছে।
এর আগে কাতারে ‘উচ্চতর’ হুমকির সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এরপর রাজধানী দোহার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার শব্দ শোনা যায়।
এর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের ভূখণ্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬:২৩—‘সংবেদনশীল ধাপ’ পেরিয়ে ‘এক ধাপ অগ্রগতি’: পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি দূততেহরানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর মানুষ পতাকা উড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন, ৮ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
রেজা আমিরি মোগাদাম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত’ পরিস্থিতি ‘সংকটপূর্ণ ও সংবেদনশীল ধাপ থেকে এক ধাপ এগিয়েছে’।
পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘পরবর্তী ধাপে বাগাড়ম্বর ও অনাবশ্যক কথার পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্য স্থান পাওয়া উচিত। পরবর্তী খবরের জন্য আরও নজর রাখুন।’
সকালে মোগাদাম শান্তির লক্ষ্যে পাকিস্তানের ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ প্রচেষ্টার’ কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন, আলোচনা একটি ‘সংকটপূর্ণ’ ধাপে পৌঁছেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার প্রথম দাপ্তরিক স্বীকৃতি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭:১৭—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ট্রাম্পের প্রতি সময়সীমা বৃদ্ধির অনুরোধ
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পের কাছে ইরান চুক্তির সময়সীমা দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ার এবং একই সময়ে ইরানের প্রতি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার আবেদন জানান। তিনি বলেন, চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আশাব্যঞ্জক ও একে একটি সুযোগ দেওয়া উচিত।
শাহবাজ শরিফ এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বেশ দৃঢ় ও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, যা নিকট ভবিষ্যতে কার্যকর ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘কূটনীতিকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে সময়সীমা দুই সপ্তাহ বৃদ্ধির জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।’
শরিফ তেহরানকেও ‘শুভেচ্ছার নিদর্শন’ হিসেবে একই সময়ের জন্য (দুই সপ্তাহ) হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার রাত ৮:২৫—আঞ্চলিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধের হুমকি ইরানের
ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সতর্ক করেছেন, ইরান ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান বছরের পর বছর এই অঞ্চলকে তেল ও গ্যাস থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করবে, যার মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের এই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা।
মঙ্গলবার রাত ৮:৪১—দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে জ্বালানি কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা
খুজেস্তান প্রদেশের নিরাপত্তাবিষয়ক উপকর্মকর্তা ঘোষণা করেন, বন্দর নগরী মাহশাহরের আমিরকবির পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। মেহের নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও সম্ভাব্য হতাহতের সংখ্যা নিরূপণ করছে।
মঙ্গলবার রাত ১০:৪৫—ট্রাম্পের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা
ইরানি ‘সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টার কম সময় বাকি থাকতে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। শরিফ ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি এই ঘোষণা দেন।
ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধবিরতি হবে ‘দ্বিপক্ষীয়’ এবং ওয়াশিংটন ইরানের কাছ থেকে ‘বাস্তবায়নযোগ্য’ ১০-দফার একটি প্রস্তাব পেয়েছে।
এর পঁচিশ মিনিট পর, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের ঘোষণার সত্যতা নিশ্চিত করে যোগ করেন, তেহরানের ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করা হলে তারা এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি মেনে চলবেন।
এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে শরিফ ১০ এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য হলো ‘সব বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনা করা’।
বুধবার ভোর ৪:০১—ট্রাম্পের মতে যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে ‘স্বর্ণযুগ’ বয়ে আনতে পারে
এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ইরানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই তার সুর বদলে যায়।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘বিশ্বশান্তির জন্য একটি বড় দিন! ইরান এটি (শান্তি) চায়, তারা অনেক সহ্য করেছে! একইভাবে, অন্য সবাইও তাই চায়!’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ঠিক যেমনটা আমরা যুক্তরাষ্ট্রে অনুভব করছি, এটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও একটি স্বর্ণযুগ হতে পারে!!!’