লেবাননকে চুক্তির ফাঁদে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র কি দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের দখলদারত্বের সুযোগ করে দিল
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা চুক্তিটি হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের মূল সংঘাতের সমাধান করার পরিবর্তে উল্টো অচলাবস্থাকে আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই চুক্তিতে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। একে আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদেরা ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেছেন।
চুক্তির মূল ভিত্তি এমন এক সমঝোতার ওপর দাঁড়িয়ে, যা কার্যকর করা অসম্ভব বলেই মনে করছেন সবাই। কারণ, হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে এবং লেবানন সরকারেরও তা জোরপূর্বক কার্যকর করার মতো কোনো ক্ষমতা নেই।
হিজবুল্লাহর অস্ত্র ছাড়ার সম্ভাবনা না থাকায় বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার একটি রাজনৈতিক অজুহাত পেয়ে গেল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর সেখানে আক্রমণ চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে লেবানন রাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আটকে গেল, যেখানে একদিকে রয়েছে তাদের পূরণ করতে না পারা কিছু বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে রয়েছে সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি ফিরে না পাওয়ার শঙ্কা।
তা ছাড়া এই রূপরেখা চুক্তিটি লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লেবাননের ভঙ্গুর কাঠামোর একটি রাষ্ট্রকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লেবাননের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ বলেন, এটি কোনো চুক্তি নয়, এটি একটি চাপিয়ে দেওয়া রফা। তিনি আরও বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার মতো সাংগঠনিক বা সামরিক সক্ষমতা লেবাননের সেনাবাহিনীর নেই। সেনাবাহিনীর কাছ থেকে এমনটা আশা করার অর্থ হিজবুল্লাহর সুদৃঢ় সামরিক সামর্থ্য এবং লেবাননের স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি যে ভঙ্গুর সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য, তাকে উপেক্ষা করা।
লেবাননের ওপর ‘বোঝা’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই এই ভারসাম্যহীনতা লুকিয়ে আছে। এতে লেবাননের ওপর ব্যাপক বাধ্যবাধকতা চাপানো হলেও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো পারস্পরিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
বৈরুতভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াং বলেন, এই চুক্তি পুরো বোঝা লেবাননের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে, যা ইসরায়েলিদের অনির্দিষ্টকালের জন্য দক্ষিণ লেবাননে থেকে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের লেবাননি গবেষক ফাওয়াজ গের্গেস বলেন, চুক্তিটি ‘মৃতাবস্থায় জন্ম নিয়েছে’ এবং এর কাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে। কারণ, এটি এমন এক শর্তের ওপর নির্ভর করছে, যা বাস্তবে পূরণ করা অসম্ভব।
গের্গেস বলেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৮–১০ কিলোমিটার (৫–৬ মাইল) গভীর একটি বাফার জোন (সুরক্ষা অঞ্চল) গড়ে তুলেছে এবং ভবিষ্যৎ সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।
গের্গেস সতর্ক করে বলেন, চুক্তির শর্তগুলোর কারণে এই বাফার জোনটি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে এবং একটি কূটনৈতিক বৈধতা পেয়ে যেতে পারে। একে একটি রাজনৈতিক ‘উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
লেবাননের এ সংঘাত মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ অবসানের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি কেন্দ্রীয় অংশ। গের্গেস বলেন, ওয়াশিংটন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই দুটি সংঘাতকে আলাদা করে দেখায় লেবাননে ইসরায়েল আরও বেশি স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা
ওয়াশিংটনে সই হওয়া এই রূপরেখা চুক্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, লেবাননের ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের কোনো দাবি নেই। তবে দক্ষিণে লেবানন সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের ওপর শর্তযুক্ত করা হয়েছে।
নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বৃহত্তর শান্তির পথ সুগম করতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনারা তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, তাদের উত্তরাঞ্চলকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করতেই এই অঞ্চল তৈরি করা হয়েছে।
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে লেবাননে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও ১০ লাখ মানুষ।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই চুক্তিকে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে লেবাননের নাগরিকেরা পুরোপুরি মুক্ত হওয়া নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি বলেন, এটি একটি ‘একতরফা নির্দেশনামূলক চুক্তি, যা লেবাননের অধিকার রক্ষা করবে না’ এবং এটি বাস্তবায়িত হবে না।
হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম এই চুক্তিকে ‘বাতিল ও অকার্যকর’ এবং একটি ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল চলে যেতে বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের যোদ্ধারা লড়াই চালিয়ে যাবেন। হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ লেবাননের ‘অভ্যন্তরীণ সংঘাতের’ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করার যেকোনো চেষ্টা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াং বলেন, ‘এই চুক্তি আমাদের গৃহযুদ্ধ এবং সম্ভবত শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ ছাড়া আর কোথাও নিয়ে যাবে না।’
বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, হিজবুল্লাহর বিলুপ্তি এমন একটি বিষয়, যা ‘কখনোই ঘটবে না’। এই চুক্তি মূলত ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতিকে বৈধতা দিচ্ছে। তিনি বলেন, বাস্তবে কিছুই হবে না। ইসরায়েলও পিছু হটবে না আর হিজবুল্লাহও অস্ত্র ছাড়বে না।
সিট্রিনোভিচ মনে করেন, হিজবুল্লাহ সশস্ত্র থাকা অবস্থায় এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সেনা প্রত্যাহারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
সিট্রিনোভিচ বলেন, এর চেয়ে যদি হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর উত্তর পাড়ে সরিয়ে নেওয়া, লেবানন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সম্প্রসারণের মতো সীমিত বিষয়ের ওপর চুক্তি হতো, তবে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
হিজবুল্লাহপন্থি বিশ্লেষক মোহাম্মদ ওবায়েদও মনে করেন এই চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। তিনি যোগ করেন, চুক্তির ধারাগুলো ‘বিস্ফোরকের মতো’, যা লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ধসিয়ে দিতে পারে। কারণ, এগুলো হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।