যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ইরানে সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক রাতেই দেশটির অন্তত ১১টি এলাকায় আঘাত হানার দাবি করেছে মার্কিন বাহিনী। জবাবে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি এসব হামলা হয়েছে গত বুধবার রাতে। এর আগে মঙ্গলবার রাতেও দুই দেশ একে–অপরের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। নতুন এই উত্তেজনা শুরু হয় মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার পর। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য, সর্বশেষ বুধবারের হামলার লক্ষ্য এই জলপথকে খোলা রাখা। যদিও জাহাজে হামলার অভিযোগ নাকচ করে আসছে তেহরান।
ইরানে হামলার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। কারণ, বুধবারের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি; আর হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, এটি ছিল হরমুজে ইরানের হামলার জবাব। ইরান আবার হামলা চালালে আরও কড়া জবাব দেওয়া হবে।
পাল্টা হুমকি দিয়েছে তেহরানও। সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করে হামলার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, আঘাত হানলে শত্রুদের পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে; আর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজায়িইর হুমকি, ‘চপেটাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকো।’
পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের পর দুই দেশের আলোচনায় বসার কথা। সেই আলোচনা ঘিরে একে অপরকে চাপে রাখতে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ রয়টার্সকে বলেন, সামনের দিনগুলোতে এমন হামলা চলতে পারে। তবে পরিস্থিতি আবার পুরোপুরি যুদ্ধের দিকে ফিরে যাবে না।
বন্দর শহর, সেতুতে হামলা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) ভাষ্য, ট্রাম্পের নির্দেশেই বুধবার রাতে হামলা চালানো হয়েছে। এ হামলায় ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, নজরদারি–সংক্রান্ত স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সংক্রান্ত স্থাপনা ও নৌবাহিনীর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পরপর দুই দিনে ইরানের প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে তারা।
ইরানের গণমাধ্যমগুলোতেও এসব হামলার খবর উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বুধবার রাতে ইরানের বন্দর আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, কোনারাক, ইরানশাহর, সিরিক, জাস্ক, আবু মুসা দ্বীপ, কেশম দ্বীপ ও আকালাসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলায় হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গল ও বুধবার—দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করলেও বেসামরিক বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যেমন বুধবারের হামলায় ইরানশাহর বিমানবন্দরের অবকাঠামোর ক্ষতি হয়। চাবাহার শহরে একটি হাসপাতালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকালা শহরে আক তেকেহ খান নামের একটি রেলসেতুতে হামলা চালানো হয়। তেহরান থেকে মাশহাদগামী একটি রেলসেতুও আক্রান্ত হয়েছে।
এসব হামলার জবাবে গতকাল বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে মার্কিন বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কুয়েতে আরিফজান সামরিক স্থাপনা, বাহরাইনে জুফাইর ও শেখ ইসা সামরিক স্থাপনা এবং কাতারে একটি সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা রয়েছে। ইরানের হামলায় একজন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে কুয়েত সরকার।
ট্রাম্পের ওপর চাপ
যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে সংঘাত, তা নিয়ে বিবাদ যুদ্ধের শুরু থেকেই। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। গত ১৭ জুন সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী হরমুজ খুলে দেওয়া হলেও এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে তেহরান। কারণ, জ্বালানি পরিবহনের এই পথ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে তারা।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ মুক্ত করতে ইরানে হামলা ট্রাম্পের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, এতে করে আবার যুদ্ধ শুরু হলে বাড়বে তেলের দাম। গতকালই দাম ১ শতাংশ বেড়েছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য এটি সুখকর হবে না। এমনিতেই রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর জনপ্রিয়তা কমে এখন ৩৪ শতাংশ।
ইরানে যুদ্ধ না চালাতে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকেও ট্রাম্পের ওপর চাপ রয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে পাস হওয়া একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালানো যাবে না। সেদিকে ইঙ্গিত করে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেন, কংগ্রেস এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তাই ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার রয়টার্সকে বলেন, হামলা চালিয়েও ইরানকে দমাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনার টেবিলেও ওয়াশিংটনের তেমন অর্জন নেই। সামরিক বা কূটনৈতিক—কোনোভাবেই ইরানের কাছ থেকে ট্রাম্প খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি নিজেই নিজেকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছেন।