বিশ্লেষণ
ট্রাম্প-সি বৈঠকের আগে আবার বেইজিং যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীন কি এগিয়ে আসবে
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আজ বুধবার চীন যাচ্ছেন। গত মে মাসে সর্বশেষ চীন সফরে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ওই সফরের অল্প সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে যান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বেইজিংয়ে এটি হবে আরাগচির দ্বিতীয় সফর। এবারও তিনি ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের পরিকল্পিত বৈঠকের ঠিক আগে দিয়ে বেইজিং যাচ্ছেন। এ মাসের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-সি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে গত মে মাসে এবং এবার সেপ্টেম্বরে ওই তিন নেতার পৃথক বৈঠকগুলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে চীনের ভূমিকার বিষয়টিকে সামনে এনেছে। চীন নিজেকে এমন একটি নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা এ সংঘাতের অবসান চায়।
সি ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় সরাসরি ভূমিকা রাখার আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও, এমন কোনো আসন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেননি।
গত শনিবার ও রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে সি চিন পিং ব্রিকস সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ লক্ষ্য অর্জনে চীন তাদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
যুদ্ধকালীন কূটনীতি
সি ব্রিকস সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় সরাসরি ভূমিকা রাখার আগ্রহের ইঙ্গিত দিলেও, এমন কোনো আসন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেননি।
এর পরিবর্তে, চীনের প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে তাঁর চার দফা বিস্তৃত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। এ পরিকল্পনার মূল বিষয় হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, চীন এমন একটি যুদ্ধের অবসান দেখতে চায়, যে যুদ্ধ আর্থিক ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে তৃতীয় কোনো দেশের সংঘাতে নিজেদের গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলা, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে—এমন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া চীন ঐতিহ্যগতভাবে এড়িয়ে চলেছে।
সি চিন পিংয়ের সর্বশেষ বক্তব্যের গুরুত্ব নিয়েও ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের মতামত রয়েছে।
সি চিন পিংয়ের বক্তব্যকে বাস্তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব হিসেবে দেখাটা অতিরঞ্জিত হবে।হামেদ ভাফায়ি, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা সাহিত্যের অধ্যাপক ও চীনবিষয়ক গবেষক
এ বিষয়ে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ গত রোববার বলেন, সি চিন পিংয়ের ‘গঠনমূলক উদ্যোগ উত্তেজনা কমানোর জন্য সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করেছে’ এবং এতে প্রমাণ হয় যে বহুপক্ষীয় কূটনীতিই ‘স্থিতিশীলতা অর্জনে একমাত্র কার্যকর পথ’।
তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা সাহিত্যের অধ্যাপক ও চীনবিষয়ক গবেষক হামেদ ভাফায়ি বলেছেন, সি চিন পিংয়ের বক্তব্যকে বাস্তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব হিসেবে দেখাটা ‘অতিরঞ্জিত’ হবে।
পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সহযোগিতা
আরাগচি চীনের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ওয়াশিংটন তেহরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আবারও মনোযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
চীন এমন একটি যুদ্ধের অবসান দেখতে চায়, যে যুদ্ধ আর্থিক ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে তৃতীয় কোনো দেশের সংঘাতে নিজেদের গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলা, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে—এমন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া চীন ঐতিহ্যগতভাবে এড়িয়ে চলেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্র ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ)’ পরিচালনা পর্ষদকে দিয়ে সফলভাবে ইরানের বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
সর্বশেষ ২০ বছর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হয়েছিল। তারপর ইরানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে ছয়টি প্রস্তাব পাস হয় এবং দেশটির ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যার ফলে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
তবে এবার বিষয়টি জাতিসংঘে তোলার পদক্ষেপকে মূলত প্রতীকী বলেই মনে করা হচ্ছে। চীন ও রাশিয়া এর তীব্র বিরোধিতা করেছে এবং নিরাপত্তা পরিষদে নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবে তাদের ভেটো দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তেহরানের ওপর পশ্চিমা চাপ অন্যদিক থেকেও অব্যাহত রয়েছে। গত বছর ইউরোপীয় দেশগুলো ‘স্ন্যাপব্যাক’ নিষেধাজ্ঞা (আগে যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল) পুনর্বহাল করায় এ সপ্তাহে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে পারেননি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ এসলামি।
যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করে চলেছে। ইরান সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে তারা ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে দেশটির ওপর আরও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
ইরানের সঙ্গে লেনদেনে সহায়তা করার অভিযোগে চীন সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার, কোম্পানি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমকেও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত চীনের বড় কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরান-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাশিয়ার ভিটিবি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের বিবৃতিতে চীনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ভিটিবি রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ ব্যাংক। চীনের মূল ভূখণ্ডে একমাত্র এ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত শাখা রয়েছে। এটির মাধ্যমে চীনের জাতীয় পেমেন্ট ব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
চীন এখনো ইরানের অশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার করেছে চীন। দেশটি মার্কিন নৌ অবরোধের আওতার বাইরে মজুত থাকা ইরানি তেলও কিনে চলেছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে চীনের সংশ্লিষ্টতাও এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর আগে ইরান চীনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ‘হাই রেজোল্যুশনের’ স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করেছিল। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প ঘটনাটিকে খাটো করে দেখান। কয়েক দিন আগে তিনি এ নিয়ে বলেছিলেন, ‘মূলত আমরা যা করছি, চীনারা সেটাই করছে’।
আলাদাভাবে সি চিন পিং সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি যথেষ্ট যুক্তিসংগত আচরণ করেছেন।’