রিয়াদকে আর নিরাপদ মনে করছে না প্রবাসীরা, হুতিদের হামলায় সৌদির ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান–সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী দেখা যায়। ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার এ হামলা হয়ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে নানা দেশের মধ্যে অশান্তি সত্ত্বেও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিল।

কিন্তু সৌদির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা সেই নিরাপত্তার অনুভূতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলো এখন দ্বিধায় পড়ে গেছে, তারা কি সত্যিই এই দেশে তাদের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারবে?

গত শনিবারে ইয়েমেনের হুতিরা ‘কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে’ হামলা চালালে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। এরপর টানা তিন দিন হামলা চালিয়েছে তারা।

এই গোষ্ঠীটি পূর্ব সৌদির তেলকেন্দ্র ও দাম্মাম বিমানবন্দরেও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে রিয়াদের সমর্থন এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাবেই তারা এই হামলা চালিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘আল আখবারিয়া’-তে প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওমরাহর জন্য মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাক পরিহিত যাত্রীরা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটাছুটি করছেন। অন্যদিকে বিমানবন্দর লাউঞ্জে ধুলোবালি জমছে এবং ছাদের প্যানেলগুলো মেঝেতে ভেঙে পড়ছে।

সাত বছর ধরে রিয়াদে বসবাসরত ৩৯ বছর বয়সী যুক্তরাজ্যের নাগরিক বিলাল মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ওমরাহ বা হজ করতে বের হয়ে কেউ যেন এভাবে জীবনের ঝুঁকিতে না পড়েন।’

বিলাল আরও বলেন, কয়েক বছর আগে যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যা-ই করে থাকুক না কেন, হুতিরা কোনোভাবেই এই ঘটনাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্যভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। সাধারণ মানুষের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং একটি বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার পক্ষে তারা কোনো যুক্তিই দাঁড় করাতে পারে না।

সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের দৃশ্য। ১০ অক্টোবর ২০২৬, রিয়াদ
ছবি: নজরদারি ফুটেজ থেকে রয়টার্সের নেওয়া

তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরব যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, এই হামলা তার মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

গত রোববার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত জ্বালানি সম্মেলনে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন প্রতিনিধি অংশ নেন। তা ছাড়া মাত্র দুই সপ্তাহ পরই সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক ইভেন্ট ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এসব হামলা স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি বজায় রাখার ব্যাপারে রিয়াদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বিলাল মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যদিও এই রাজ্যের উচ্চ বেতনের চাকরি আর আরামদায়ক জীবন ছেড়ে দেওয়া তার জন্য কঠিন হবে। তবু হামলার ভয়াবহতা ও ধারাবাহিকতা অনেক প্রবাসী পরিবারকে ভাবতে বাধ্য করছে, বেসামরিক স্থানগুলো আদৌ নিরাপদ কি না।

বিলাল বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমার পরিবার আর আমি এখানেই একটা জীবন গড়ে তুলেছি। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা বাড়তে থাকলে আমি কি তাদের ফেরত পাঠানোর কথা ভাবব? অবশ্যই ভাবব।’

এক দশক ধরে রিয়াদে বসবাস করা মোহাম্মদ নামের যুক্তরাজ্যের আরেক নাগরিক বলেন, পরিবার লালনপালনের জন্য সৌদি আরবকে নিরাপদ মনে করলেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই বিমানবন্দরকে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থা রক্ষা করতে না পারায় তিনি আতঙ্কিত।

মোহাম্মদ বলেন, ‘যা ঘটছে, তাতে আমার বাচ্চারাও বেশ ভয় পেয়ে গেছে।’

যুক্তরাজ্যের এই নাগরিক বলেন, ‘আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি, তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির প্রকাশ্যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানোর কারণে ওদের কাছে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা অনেক কঠিন হয়ে উঠছে।’

মোহাম্মদ বলেন, ‘রিয়াদকে আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

এসব হামলা সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের সংঘাতের এক বিপজ্জনক সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে হুতিরা।

সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী জুলাই মাসে সানা বিমানবন্দরে হামলা চালানোর আগপর্যন্ত এই সংঘাত অনেকটাই স্থবির ছিল। তখন সৌদি হামলার উদ্দেশ্য ছিল, ইরান থেকে হুতি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমানকে বিদ্রোহীনিয়ন্ত্রিত রাজধানীতে অবতরণ থেকে বিরত রাখা।

জবাবে হুতিরা পাল্টা হামলা চালানো ও অবরোধ আরোপের হুমকি দেয়। তারা ঘোষণা দেয়, নিজেদের আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবস্থার সুবিধা সীমিত করার জবাবে তারা সৌদির স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে হামলা চালাবে।

পরবর্তী সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পর লোহিত সাগরই ছিল সৌদি আরবের তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।

সাম্প্রতিক এই সংঘাতের শিকড় রয়েছে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া শত্রুতার গভীরে। জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাস নিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন নিরসনে জাতিসংঘ-পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত জাতীয় সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল হুতিরা।

নতুন একটি ফেডারেল কাঠামোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর ইরান-সমর্থিত হুতিরা দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয় এবং রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ফলে প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পিছু হটতে হয়।

হুতিদের এই অগ্রযাত্রার কারণে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে আবার ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ও যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমানে সজ্জিত হয়ে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ভয়াবহ এক যুদ্ধ শুরু করে। এতে ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও জরুরি সেবার ধ্বংসের কারণে ইয়েমেনে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

২০১৫ সালে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর পর থেকে সৌদি আরবকে বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের কেন্দ্রে রূপান্তর করার চেষ্টা করে আসছেন।

তবে হুতিদের হামলা এবং পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধসহ আঞ্চলিক সংঘাতের কাছে যুবরাজের সেই অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাজুক হয়ে ওঠে। হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

কয়েক দশক ধরে বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো বা যোগাযোগের সুবিধা দিয়ে আসছে। মার্কিন অস্ত্র ও প্রযুক্তির পেছনে তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।

বিনিময়ে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের প্রধান সামরিক অংশীদার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে কাজ করেছে।

তবে সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলের এক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, এই সম্পর্কে এখন চরম টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

ওই বিশ্লেষক বলেন, ট্রাম্প সৌদি আরবকে এটা বলতে পারেন না, তারা নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই সামলাক। পাশাপাশি তিনি আশা করতে পারেন না, সৌদি আরব তাঁর এমন বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে মেনে নেবে।

উপসাগরীয় বিশ্লেষক

ওই বিশ্লেষক বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতি বাদ দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পথে হাঁটার সিদ্ধান্তে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই উদ্বেগ জানিয়েছে। ফলে আঞ্চলিক মিত্রদের এমন এক সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে, যা তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।

রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্প যখন বলেন সৌদি আরব নিজেই ‘নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম’, তখন সেই অসন্তোষ আরও গভীর হয়।

এই অনিশ্চয়তা গত আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অবশ্য আঙ্কারা তার পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করায় সৌদি আরবে তুর্কি সেনা মোতায়েনের সময় ও পরিধি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ওই বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্রে বিনিয়োগ করতে এবং ওয়াশিংটনকে কেন্দ্র করে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছে। কিন্তু যখন হুমকি বাস্তবে রূপ নিল, তখন এটাকে ‘সৌদি আরব সামলাতে পারবে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সেই অংশীদারত্বের প্রকৃত মূল্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।