ইরাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া সুদানি আসলে কে

ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির নাম ঘোষণা করা হয়েছে
ছবি: রয়টার্স

ইরাকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল লতিফ রশিদ। এতে কয়েক মাস ধরে দেশটিতে চলা রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হলো। এখন নজর নতুন সরকার গঠনের ওপর। গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে এ কাজই ইরাকের রাজনীতিবিদেরা করতে পারছিলেন না।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রশিদ। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির নাম ঘোষণা করেন তিনি।

এ দায়িত্বের জন্য আল-সুদানিকে মনোনয়ন দেয় ইরান-সমর্থিত শিয়া কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক। বর্তমানে পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন রয়েছে এই জোটের।

তবে আল-সুদানির এই মনোনয়ন দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রভাবশালী শিয়া নেতা মোকতাদা আল-সদর। গত বছরের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সবচেয়ে ভালো ফল করেছে। কিন্তু সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করে তারা।

গত ২৫ জুলাই কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক আল-সুদানিকে মনোনয়ন দিলে রাজধানী বাগদাদে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের নির্বাচনের পর এটি ছিল কয়েকটি বিক্ষোভের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ওই সময় বাগদাদের সুরক্ষিত গ্রিনজোন এলাকায় ঢুকে পড়েন সদরের সমর্থকেরা। আল-সুদানির মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিতে তাঁরা পার্লামেন্টেও চড়াও হন।

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেতে পারে, এমন একটি সরকার গঠনের জন্য আল-সুদানির হাতে এখন ৩০ দিন সময় আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রেসিডেন্ট রশিদ তাঁকে মনোনীত করায় পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে।

কে এই আল-সুদানি

ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করেন আল-সুদানি। ইরান-সমর্থিত ইসলামিক দাওয়া পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁর বাবাকে হত্যা করে প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের হোসেনের সরকার। তখন আল-সুদানির বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর।

সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের লক্ষ্যে পরে ১৯৯১ সালের শিয়া বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন আল-সুদানি। ওই সময় সরকারের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে অনেকেই অন্য দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু আল-সুদানি দেশেই অবস্থান করেন।

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর গত দুই দশকে মোকতাদা আল-সদর দেশটির বিকল্প নেতা হয়ে উঠেছেন
ছবি: এএফপি
আরও পড়ুন

ইরাকভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহানাদ আদনান বলেন, ‘যাঁরা ইরাকে অবস্থান করেছিলেন, দেশটির বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁদের বোঝাপড়া তুলনামূলক ভালো। যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তিনিই হবেন প্রথম ইরাকি, যিনি ওই পরিস্থিতিতে দেশে ছিলেন, যাঁদের এ সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।’

ইরাকে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের পতন হয়। এরপর আল-সুদানি স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে আমারাহ শহরের মেয়র হন। পরে নিজের প্রদেশ মায়সানের গভর্নর হন।

পরবর্তী সময়ে নুরি আল-মালিকি ও হায়দার আল-আবাদি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পালন করে আল-সুদানি। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মানবাধিকারবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল নাগাদ শ্রম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন

নিরপেক্ষতা প্রমাণে দলত্যাগ

ইরাকের রাজনীতিতে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের দাবিতে ২০২০ সালে গণবিক্ষোভ হয়। এরপর দাওয়া পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন আল-সুদানি। পার্টির সাধারণ সম্পাদক মালিকির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

ঠিক কোন কারণে আল-সুদানি ইসলামিক দাওয়া পার্টি ছেড়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে অনেকেই বলছেন, দাওয়া পার্টির আদর্শিক অবস্থানকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার পরিবর্তে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা থেকে তিনি এমনটি করেছিলেন।

মোহানাদ আদনান বলেন, ‘ইরাকে একজন নিরপেক্ষ প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর দিকেই জনমতের পাল্লা ভারী। ফলে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে দেখাতে তিনি দাওয়া পার্টি ছেড়েছেন। তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলতে চাননি। বরং প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।’

২০১৯ সালে রক্তাক্ত গণবিক্ষোভের জেরে পদত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদিল আবদুল মাহদি। এর পর থেকে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনে হিমশিম খাচ্ছে ইরাকের পার্লামেন্ট। আল-সুদানি তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী মুস্তফা আল-কাদিমিকে সমর্থন করেছিলেন বলেই মনে করা হয়।

তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বাইরে থেকে প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিতে হবে। ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড় থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন আল-সুদানি।

আরও পড়ুন

সদরের বিরোধিতা

আল-সুদানি বর্তমানে রাজনৈতিক দল ইউফ্রেতিস মুভমেন্টের নেতা। গত বছরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলটি তিনটি আসন পায়। পরে শিয়া কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের জোটে যোগ দেয় তাঁর দল। জোটটি পার্লামেন্টে সদরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।

গত জুনে সদরের ৭৩ জন আইনপ্রণেতা পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন। নতুন সরকার গঠনে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়াতেই দলটি এ পথে হেঁটেছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এতে পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় জোটে পরিণত হয় কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক। তারা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আল-সুদানিকে মনোনয়ন দেয়।
গত ২৯ আগস্ট ভালো কিছুর জন্য রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন সদর। তিনি বলেন, দলের সঙ্গে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানও বন্ধ থাকবে। এ ঘোষণার পর তাঁর সমর্থকেরা আবারও পার্লামেন্টে ঢুকে ভাঙচুর চালান। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সদরের সমর্থকদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন নিহত হন।

জুলাই ও আগস্টে পার্লামেন্টে চড়াও হওয়া বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তাঁরা দুর্নীতি, ক্ষমতাসীন অভিজাত ও বহিরাগত দেশের প্রভাব খাটানোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। নুরি আল-মালিকির বিরুদ্ধে তাঁদের স্লোগান দিতে দেখা যায়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেন তাঁরা। একই অভিযোগ রয়েছে আল-সুদানির বিরুদ্ধেও।

ইরাকের পার্লামেন্ট ভবনে মোকতাদা আল-সদরের সমর্থকেরা
ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

স্যাম হিউস্টন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জেইনাব শুকের আল-জাজিরাকে বলেন, দীর্ঘদিনের শত্রু সাবেক প্রধানমন্ত্রী মালিকিকে আল-সুদানির ‘ছায়া কর্তৃত্ব’ হিসেবে দেখছেন সদর।

শুকের বলেন, ‘যেহেতু আল-সুদানিকে সদরপন্থীরা মালিকির লোক মনে করে থাকেন, সে জন্য মালিকির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আল-সুদানি রাষ্ট্রে এবং এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সদরপন্থীদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন বলে তাঁদের আশঙ্কা।’
ম্যালকম এইচ কের কার্নেগি মিডলইস্ট সেন্টারের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো হারিথ হাসান বলেন, সামনে যেসব বিষয় দেখার, তার একটি হলো আল-সুদানি কীভাবে অন্যদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে আল-সদরকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি এখন আর আল-মালিকির লোক নন।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো হামজাহ হাদাদ আল-জাজিরাকে বলেন, আল-সুদানিই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী হতে পারেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী পদে কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের বিবেচিত মালিকি ও আবাদির মতো অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তাঁর ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব’ তুলনামূলক কম।

হামজাহ হাদাদ বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে একজন মধ্যমপন্থী প্রধানমন্ত্রীরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকবে।’