কীভাবে যুদ্ধে মানিয়ে নিতে হয়, দেখিয়ে দিচ্ছে ইরানের সামরিক বাহিনী
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে বলে দাবি করলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে ইরানি সামরিক বাহিনী তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করছে।
১১ দিন আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থাগুলোকে নিশানা বানিয়েছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
মার্কিন সেনারা অবস্থান করছেন এমন সব হোটেলে হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। ইরাকের ইরবিলে একটি বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোন হামলা চালিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, পেন্টাগন তার সেনাদের কোথায় রাখছে, সে খবর তেহরানের কাছে আছে।
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান সম্ভবত বুঝতে পেরেছে, তারা সরাসরি শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমান হতে পারবে না। তবে এই ব্যাপক হামলার মুখেও টিকে থাকতে পারলেই তেহরান একে নিজেদের ‘বিজয়’ হিসেবে দাবি করতে পারবে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত করছে। বিশেষ করে সেই ইন্টারসেপ্টর ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোতে, যা এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা ও সম্পদ রক্ষায় ব্যবহার হয়ে থাকে।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৭ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০৮ জন আবার কর্মস্থলে ফিরেছেন। অন্যদিকে ইরান সরকারের দাবি অনুযায়ী, তাদের দেশে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবাই বেসামরিক নাগরিক। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ভান্ডারে বড় ধরনের টান পড়েছিল। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের মোট ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছিল।
জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ইরান–বিশেষজ্ঞ ভ্যালি আর নাসর বলেন, ‘এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয়, ইরান কত দ্রুত আগের যুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছে। তারা বুঝে গেছে, তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা কোথায়।’
আর নাসর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মজুত কমিয়ে দেওয়ার পর ইরান হয়তো আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাতে পারে।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, ইরান তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। তবে নিরাপত্তার খাতিরে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
আগে ইরান সাধারণত হামলার আগে সতর্কবার্তা দিত বা কেবল সম্মান রক্ষার জন্য নামমাত্র হামলা চালাত। যেমন গত বছর ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইরান কাতারের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার আগে সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
তবে এবার তেমনটি ঘটছে না। সম্প্রতি তারা কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটির একটি অত্যাধুনিক আগাম হামলার সতর্কবার্তার রাডার ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। এ ছাড়া কুয়েতের ঘাঁটি আরিফজান ও আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটির যোগাযোগ পরিকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে ইরান তাদের সব ড্রোন হামলা ইসরায়েলের দিকে চালাত। কিন্তু এবার তারা কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন মিত্র ও সম্পদ লক্ষ্য করে হাজার হাজার সস্তা ড্রোন ছুড়ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল মঙ্গলবার স্বীকার করেন, প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের এমন ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তাঁরা প্রত্যাশা করেননি। তবে তিনি একে ইরানের ‘হতাশার বহিঃপ্রকাশ’ এবং ‘বড় ভুল’ বলে বর্ণনা করেছেন।
জেনারেল কেইন দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার কারণে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৩ শতাংশ কমেছে।
তবে পেন্টাগনের ভেতরে এখনো উদ্বেগ রয়েছে, ইরানের সব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র সম্পর্কে তাদের কাছে পরিষ্কার ধারণা নেই। ইরান হয়তো তাদের উন্নত ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বড় কোনো লক্ষ্যের জন্য জমিয়ে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের শুরুতেই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও ইরান ভেঙে পড়েনি। তারা এমনভাবে কাজ করছে, যা দেখে মনে হয় না যে তাদের নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।