ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের চেয়ে মিত্রদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে বেশি
যুদ্ধে অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো প্রায়ই সামরিক লক্ষ্যের চেয়ে ভিন্ন একটি যুক্তিতে চলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিনা উসকানিতে চালানো অবৈধ হামলা এর একটি বড় নজির।
এই দুই আগ্রাসনকারীর উত্থাপিত বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে (যদিও যা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে) তেহরানকে দুর্বল করার আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক প্রভাব মূলত ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের ওপরই পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে যুদ্ধটি একটি অসম ধাক্কা দিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়া এখন জ্বালানি–সংকট, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথ পরিবর্তনের ধকল সহ্য করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির এক-পঞ্চমাংশ, অপরিশোধিত তেল ও সার রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ, হিলিয়াম রপ্তানির দুই-পঞ্চমাংশ এবং সালফার রপ্তানির প্রায় অর্ধেক এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্র এবং ট্যাংকারগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হওয়ায় জাহাজ চলাচল থমকে গেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাসের গুরুত্ব সবারই জানা। খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য উপাদান সার আর হিলিয়াম ও সালফার ব্যবহৃত হয় মাইক্রোচিপ তৈরিতে। ফলে বিশ্ব এখন একই সঙ্গে জ্বালানিঘাটতি, খাদ্য সরবরাহ সংকট এবং ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন, যা ঘাস কাটার যন্ত্র থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–সমর্থিত (এআই) ডেটা সেন্টার পর্যন্ত সবকিছুকেই প্রভাবিত করতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যায় এশিয়ায়, বাকি ১০ শতাংশ যায় ইউরোপে। তেলের ক্ষেত্রে, হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ যায় এশিয়ায়, যেখানে ইউরোপে যায় মাত্র ৪ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
এ কারণেই এশিয়া এখন সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ চিপ তৈরির জন্য তাইওয়ানের কথা ছেড়ে দিলেও এ অঞ্চলে চীন থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান থেকে ভারতের মতো উৎপাদন খাতের বৃহৎ শক্তিশালী দেশ রয়েছে। তারা এখন পণ্যঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহশৃঙ্খলের পথ পরিবর্তনের এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে শেয়ারবাজারের পতনের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা গেছে। জিডিপির ৫ দশমিক ৭ শতাংশের সমপরিমাণ জ্বালানিঘাটতি এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ১২ শতাংশ পতন হয়েছে। থাইল্যান্ড (১০ দশমিক ৭ শতাংশ পতন), ভিয়েতনাম (৮ দশমিক ৮ শতাংশ পতন) ও জাপানেও (৭ দশমিক ২ শতাংশ পতন) একই পরিণতি হয়েছে।
এগুলো কেবল তত্ত্বগত আর্থিক পরিবর্তন নয়, এশিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস হয়ে যাওয়া পুঁজি, বিলম্বিত বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের খরচের চিত্র তুলে ধরে।
কাতারের ওপর এশিয়ার নির্ভরশীলতা এই বিপর্যয় প্রমাণ করে দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি স্থাপনা রাস লাফান ইরানের প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কাতারএনার্জি স্বীকার করেছে, তাদের রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
এশীয় ক্রেতাদের জন্য এটা সত্যিই হতাশাজনক। ২০২৪ সালে কাতারের এলএনজি রপ্তানির ২০ শতাংশ গেছে চীনে, ১২ শতাংশ ভারতে, ১০ শতাংশ দক্ষিণ কোরিয়ায়, ৭ শতাংশ পাকিস্তানে এবং ৬ শতাংশ তাইওয়ানে। এই দেশগুলো এখন কমে যাওয়া সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
ইউরোপের অর্থনৈতিক ভোগান্তি এশিয়ার মতো এতটা তাৎক্ষণিক না হলেও এটি সম্ভাব্যভাবে বেশি বিপজ্জনক। কারণ, এই মহাদেশের জ্বালানির মজুত কমে গেছে এবং আসছে শীতের জন্য মজুত পুনরায় পূর্ণ করার সময় ঘনিয়ে আসছে।
ডিজেল ও পরিশোধিত পণ্যের জন্য ইউরোপ এখনো বিশ্ববাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এশিয়ার ক্রেতারা বিদ্যমান সরবরাহের জন্য বেশি দাম হাঁকায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন ডিজেলশূন্য ট্যাংকের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে মহাদেশ ট্রাক পরিবহন, কৃষি ও নির্মাণকাজের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এ এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি।
ইউরোপের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো তাদের গ্যাসের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া। বর্তমানে ইউরোপীয় মজুত স্থাপনাগুলোতে ধারণক্ষমতার মাত্র ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ গ্যাস রয়েছে, যা গত কয়েক বছরের এই সময়ের তুলনায় অনেক কম।
ইইউ ম্যান্ডেট অনুযায়ী, শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই এই মহাদেশের গ্যাস মজুত ৯০ শতাংশ পূর্ণ করতে হবে। উপসাগরীয় এলএনজি সরবরাহ এবং রাশিয়ার পাইপলাইন বন্ধ থাকায় মার্কিন ও নরওয়েজিয়ান গ্যাসের জন্য ইউরোপকে এখন এশিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে।
কয়েকজন বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন যে অক্টোবরের মধ্যে মজুত যদি ৮০ শতাংশেও পৌঁছায়, তবু এটি হবে ‘বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরগুলোর একটি’। এর ফলে ২০২২ সালের মতো আরেকটি চরম জ্বালানি–সংকট দেখা দিতে পারে।
নির্মম হিসাব–নিকাশ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এরই মধ্যে গ্যাসের দাম ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এই দাম আগামী ছয় মাসের জন্য প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৯০ ইউরো (১০৪ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা ২০২৭ সালের আগে যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।
সামষ্টিক অর্থনীতির পরিণতি এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইউরোপের শিল্পের চালিকা শক্তি জার্মানির শেয়ারবাজারে ৮ শতাংশ দরপতন ঘটেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ও ইতালির শেয়ারবাজারে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৬ শতাংশ দরপতন হয়েছে। ইউরোপের প্রতিটি প্রধান অর্থনীতিই নিট জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, যার মধ্যে গ্রিস (জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশ), ইতালি (২ শতাংশ) ও স্পেন (১ দশমিক ৮ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ইউরোপ যখন ইউক্রেন-পরবর্তী একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ এসে হাজির হয়েছে। এটি তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির আশাকে পিষে দিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
এ সংকটের সবচেয়ে রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই অর্থনৈতিক পরিণতির ক্ষেত্রে কম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে, অথচ তারা মিত্রদের এর ব্যয়ভার বহনের জন্য চাপ দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন বড় মুনাফার মুখ দেখবে; কারণ, ইউরোপীয় ও এশীয় ক্রেতারা মার্কিন এলএনজি ও অপরিশোধিত তেল কিনতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ হিসাব–নিকাশ অত্যন্ত রূঢ়ভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি–সংকটে ধুঁকতে থাকা মিত্রদের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, ‘তাদের উচিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা, আমাদের কাছে প্রচুর আছে...(অথবা) প্রণালিতে যাও এবং গিয়ে কেড়ে নাও। তোমাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজেদের জন্য লড়তে হয়। যুক্তরাষ্ট্র আর তোমাদের সাহায্য করতে যাবে না।’
এ বিবৃতি প্রতিনিয়ত আগুন লাগানো একজন ব্যক্তির মতো, যিনি কিনা নিজের জ্বালানো আগুন নেভাতে ভুক্তভোগীরা পর্যাপ্ত সাহায্য না করায় উল্টো তাদেরই দোষারোপ করেন।
সত্যি বলতে, ইউরোপ এখন নীরব দর্শকের মতো দেখছে, কীভাবে এমন একটি সংঘাতের কারণে তাদের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে, যে সংঘাতে তারা সায় দেয়নি এবং যা তারা নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ হয়তো সীমিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক পরিণতি হবে পশ্চিমা জোটের ভাঙন এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলোর অর্থনীতি চরম দুর্বল হয়ে পড়া। এই ডামাডোল থেকে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হচ্ছে আর মিত্রদের নিজেদের পথ নিজেদেরই দেখতে বলছে।
ইরানের অর্থনীতি যে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত। তবে এই বৃহত্তর আক্রমণের শিকার হচ্ছে মূলত সেই দেশগুলোই, যাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ঐতিহাসিকভাবে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন যেখানে ন্যাটোকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল, সেখানে ইরান যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি এই জোটকে স্থায়ীভাবে ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
এটি একটি জরুরি প্রশ্নের জন্ম দেয়: ইউরোপীয় নেতারা গত চার বছরে নেওয়া তাঁদের বৈদেশিক নীতির সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা কবে শুরু করবেন? ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মার্কিন মিত্ররা কবে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শিক্ষাটি শিখবে, যা আজকের দিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক—যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়াটা হয়তো বিপজ্জনক, কিন্তু মিত্র হওয়াটা হতে পারে মারাত্মক?
মার্কো কার্নেলোস: ইতালির সাবেক কূটনীতিক। রাষ্ট্রদূত ছিলেন ইরাকে, দায়িত্ব পালন করেছেন সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাতিসংঘে। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ইতালির তিনজন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক দপ্তরে কাজ করেছেন। সম্প্রতি তিনি ইতালি সরকারের মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়ার সমন্বয়ক ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।