নেতৃত্ব পরিবর্তনেই কি ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশের পরবর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতা নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ একজোট হয়েছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাঁদের সমালোচনার কমতি না থাকলেও গাজা ও আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।
ইতিমধ্যে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবু দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনেট ও লাপিদ বাজি ধরছেন যে অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলে তাঁরা ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।
এপ্রিলে সরকার গঠনের প্রচারণা শুরু করে চরম ডানপন্থী বেনেট ভোটারদের ‘সংশোধনের এক যুগের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর ভাষায় নেতানিয়াহুর আমলের বিভেদ ও একঘরে অবস্থার অবসান ঘটিয়ে ‘পেশাদার’ ও ‘ইসরায়েলের মঙ্গলে নিবেদিত’ নেতারা দেশ চালাবেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে একঘরে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। জাতিসংঘের একটি কমিশন গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউরোপে স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে।
শুধু তা–ই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্য থেকেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্থগিতের চাপ বাড়ছে। এমনকি ইসরায়েলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপেও দেখা গেছে, দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেই ইসরায়েলের একাধিক যুদ্ধ ও মার্কিন রাজনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (ইসিএফআর) পলিসি ফেলো বেথ অপেনহেইমের ‘ইসরায়েল ক্রমেই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে’ মন্তব্যটি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনমত জরিপের দিকে ইঙ্গিত করে আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আপাতত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রকাশ্যে “বন্ধুত্ব” বজায় আছে, তবে ইরান ও লেবানন যুদ্ধে সেই সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ট্রুথ সোশ্যালে ইসরায়েলকে লজ্জাজনক আদেশ দিচ্ছেন।’
এদিকে ইউরোপে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। কেবল হলোকাস্টের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি বাহিনী পদ্ধতিগতভাবে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যার ঘটনা) স্মৃতি এবং বাণিজ্য ও অস্ত্র চুক্তির স্বার্থগত হিসাব-নিকাশ ইউরোপকে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া থেকে আটকে রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
অথচ গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর অব্যাহত দখলদারত্বের বিষয়ে বেনেট ও লাপিদের কোনো উল্লেখযোগ্য সমালোচনা নেই। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা মনে করেন নেতানিয়াহু যথেষ্ট কঠোর হননি।
২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েলের হাতে নিহত হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বা বেঁচে থাকা মানুষদের মানবিক সংকটের বিষয়টি তুলে না ধরে, গত বছর বেনেট হামাসকে গাজার বেসামরিক কাঠামোর সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত বলে উপস্থাপন করেছিলেন, যেটা ইসরায়েলের চলমান হামলাকে ন্যায্যতা দেয়।
নিউইয়র্কের সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মূলত বেনেট ও লাপিদ এই ধারণার ওপর নির্ভর করছেন যে বিশ্বজুড়ে মানুষ ইসরায়েলকে নয়, নেতানিয়াহুকে ঘৃণা করে। বলা যায়, এখনো পর্যন্ত তাঁরা একে অপরের চেয়ে বেশি যুদ্ধবাজ হওয়ার প্রতিযোগিতায় মাতছেন।’
পিনকাস আরও বলেন, ‘লেবানন, হরমুজ প্রণালি, এমনকি ইরান নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের মূল ভিত্তি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেননি। নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইরানের জনগণ উঠে দাঁড়াবে, তা কেন হলো না? সেটা কি কেউ জিজ্ঞেস করেছেন? বা ফিলিস্তিন নিয়ে নতুন কোনো নীতি প্রস্তাব করেছেন? না! তারা শুধু যুদ্ধবিরতির সমালোচনা করেছেন।’
একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু
ইউরোপীয় নেতারা আগের চেয়ে বেশি সমালোচক হলেও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা, যেটা এখনো অটুট। আর বেনেট ও লাপিদ সেই সম্পর্ককেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।
রাজনৈতিক জরিপ বিশেষজ্ঞ মিচেল বারাক আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বেনেট ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে নিতে চাইবেন।’
ইউরোপীয় ক্ষোভ নিয়ে ইসরায়েলি জনমনে তেমন উদ্বেগ না থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ ও পশ্চিমের অনেকে যা করার করবে, কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কই জনমতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। এখন নেতানিয়াহুর সেটা আছে, তবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়লে ট্রাম্প বিষয়টা নেতিবাচকভাবে নেবেন। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেরে যাওয়া মানুষকে পছন্দ করেন না।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা আসলে কতটা গভীরে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। পশ্চিমা সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য এবং উন্নত প্রযুক্তি ও স্পাইওয়্যার বাণিজ্য থেকে লাভবান হয়ে আসছে। শীর্ষ নেতৃত্বে রদবদল হলে সেটা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে বলে অপেনহেইম মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা জনগণ ইসরায়েলের প্রতি ক্রমেই বৈরী হয়ে উঠলেও দেশগুলোর সরকার এখনো চাইছে যেন পদক্ষেপ না নিতে হয়। একটি গ্রহণযোগ্য নতুন সরকার ইউরোপীয় নেতাদের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করার সুযোগ দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে নতুন সরকার এলেই মৌলিক গতিপথ পাল্টাবে না। তারা ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রতি আরও কঠোর হতে পারে, বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস দমন করতে পারে এবং কূটনৈতিক ছাড় দেওয়ার সুযোগে হয়তো এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রশ্ন প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে ইহুদি-ইসরায়েলি সব দলে প্রায় ঐকমত্য আছে, আর নিরাপত্তা নীতিতে কঠোরতা তো রয়েছেই। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট আদর্শগতভাবে একজন প্রকৃত ডানপন্থী, আর গাদি আইজেনকট, ইয়ার লাপিদসহ অন্য মধ্যপন্থীরা বাজপাখির মতো একে অপরকে ছাড়িয়ে কঠোর বক্তব্য দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।’
ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে আরও একটি পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তারা নেতানিয়াহুর সরে যাওয়াকে ইসরায়েলের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ হিসেবে নিতে পারে, যে চাপ মূলত ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে জনগণের ঘৃণার উদ্রেক করেছে। অথবা তারা স্পষ্ট করতে পারে যে কেবল নেতৃত্ব নয়, ইসরায়েলকে নীতি বদলাতে হবে। অর্থাৎ দীর্ঘ মেয়াদে পরিবর্তন অপরিবর্তনীয়।
অপেনহেইম বলেন, ‘ভদ্র ভাষায় কথা বলা একটি নতুন ইসরায়েলি নেতৃত্ব পশ্চিমা সরকারগুলোকে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করার সুবিধাজনক সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু নীতি না বদলালে দীর্ঘ মেয়াদে পশ্চিমের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত সংঘাত এড়ানো ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব হবে না।’