ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রই কি রক্ষাকবচ হয়ে উঠছে

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডার পাম বিচের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ২৩ মার্চ ২০২৬ছবি: এএফপি

ইরান যুদ্ধের পক্ষে অনেকগুলো কারণ দেখানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যুক্তিটি হলো—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করতে এই হামলা প্রয়োজন ছিল।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) গত মে মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত আছে। এসব ইউরেনিয়াম আরও কিছুটা সমৃদ্ধ করা হলে অন্তত ৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমা তৈরি করা সম্ভব।

এ ছাড়া ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আর কোনো দেশে এত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেই। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তাদের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি পশ্চিমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। বিষয়টি খুব সহজ—তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র এবং বিজ্ঞানীদের ওপর চলমান হামলা সাময়িকভাবে দেশটির লক্ষ্যকে ধীর করে দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সব লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে, ইরানের বর্তমান সরকার এই যুদ্ধ থেকে টিকে যাবে। যদি তারা টিকে থাকে, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য দেশটি আরও বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক রমেশ ঠাকুর একসময় জাতিসংঘের হয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের জন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রই হলো টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তাই তারা কেন এটা তৈরি বা সংগ্রহ করবে না?’

এখন পর্যন্ত সব লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে, ইরানের বর্তমান সরকার এই যুদ্ধ থেকে টিকে যাবে। যদি তারা টিকে থাকে, তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য দেশটি আরও বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বোমাই হতে পারে তাদের জন্য দ্রুততম পথ। বিশেষ করে এমন একটি সরকারের জন্য, যারা আলোচনার মাঝপথে দুবার আক্রান্ত হয়ে এখন আরও বেশি কট্টরপন্থী হয়ে উঠেছে।

ভবিষ্যতে কেবল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ভাবলেই চলবে না। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি বিশ্বের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ রয়েছে। গত মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ইরানের পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, তাঁর দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ধরে রাখার (আন্তর্জাতিক কোনো কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে না দেওয়ার) সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদ ও আগ্রাসনের’ অভিযোগ তোলেন।

রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সামরিক যান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় তথাকথিত দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রগুলোর কাছে বার্তাটি আসলে আগে থেকেই পরিষ্কার ছিল। লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও ইরাকের সাদ্দাম হোসেন—উভয়েই তাঁদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি হওয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন (সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেনও স্বেচ্ছায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করে। এ জন্য দেশটি এখন নিশ্চিতভাবে অনুশোচনা করছে)।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও নিরপেক্ষ দেশগুলোর ওপর ইরান যুদ্ধে প্রকৃত প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। তারা এখন নিজেদের পারমাণবিক সুরক্ষার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে।

ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেরিয়ে গিয়ে কথিত দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রগুলোর কাছে এই বার্তা আরও জোরালো করেছেন। এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়, অনিশ্চিত স্বভাবের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা নিরর্থক। কারণ, দেশটির যেকোনো প্রশাসন চাইলে তাদের আগের সরকারের যেকোনো চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং নিরপেক্ষ দেশগুলোর ওপর ইরান যুদ্ধে প্রকৃত প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। তারা এখন নিজেদের পারমাণবিক সুরক্ষার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। ট্রাম্পের অপমানজনক আচরণ, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি এবং ন্যাটোকে গুরুত্বহীন করার চেষ্টার কারণে ইউরোপ আগে থেকে দিশাহারা ছিল। এসব দেশ এখন রাশিয়ার হাত থেকে বাঁচতে নতুন প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে আলোচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে যাওয়ার পথে, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
ছবি: এএফপি

এই নতুন জোট পূর্বাঞ্চলে ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করবে, নাকি জার্মানি বা পোল্যান্ডের মতো সদস্যরাষ্ট্র নিজেরাই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইউরোপের এসব দেশে যে নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এরই মধ্যে দাবি করেছেন, পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশ বেলারুশে মোতায়েন করা হয়েছে।

ইরানের জন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রই হলো টিকে থাকার একমাত্র গ্যারান্টি। তাই তারা কেন এটা তৈরি বা সংগ্রহ করবে না?
রমেশ ঠাকুর, ইমেরিটাস অধ্যাপক, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্যও বড় এক সতর্কবার্তা। ইরানের পাল্টা হামলার পর এসব দেশ বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা কতটা অসার। ইরানের হামলার মুখে এসব দেশের স্থানীয় জনগণ বা অবকাঠামো রক্ষা করার চেয়ে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি বাঁচানোই ছিল ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ ও অর্থনীতিকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষক রমেশ ঠাকুরের মতে, ইরান যদি চলতি যুদ্ধে টিকে যায়, তবে তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়বে। এর ফলে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত মিসরও নিজেদের সুরক্ষায় নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের পথ খুঁজতে শুরু করবে।

পূর্ব দিকে ভারত ও পাকিস্তান এরই মধ্যে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের পর এ দুই দেশের কোনোটিই তাদের অবস্থান (পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ) থেকে পিছিয়ে আসবে না। তবে পূর্ব এশিয়া থেকেই প্রকৃত পরিবর্তন আসতে পারে। সেখানে কিম জং উনের আগ্রাসী মনোভাব এবং তাইওয়ানের ওপর চীনের নজরদারি পারমাণবিক বিতর্কে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার পর
ছবি : লস আলমোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সৌজন্যে

দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে জনসমর্থন গত বছর রেকর্ড ৭৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা ছায়া’র (নিউক্লিয়ার আমব্রেলা) ওপর নির্ভরশীল। তা নিয়ে দেশটির মানুষের মধ্যে নজিরবিহীন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সিউলের ট্রয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল পিঙ্কস্টন বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বদলীয় অবস্থান ছিল, আমরা আপনাদের সুরক্ষা দেব, তাই আপনাদের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এ ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী নয়।’

নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করলে একটি রাষ্ট্র তার নিজের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে পারে না। এ কারণে তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রেখেছে।
সামরিক বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ, চিন্তক গোষ্ঠী ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ

জাপানের পরিস্থিতি তুলনামূলক জটিল। কারণ, তারাই একমাত্র দেশ যারা পারমাণবিক হামলার শিকার হয়েছে। গত ডিসেম্বরে জাপান সরকারের একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান ঝুঁকি বিবেচনায় জাপানের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত। মূলত জনমত যাচাই করতেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাপানের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি থেকে এরই মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম উৎপাদিত হচ্ছে। ২০১৪ সালে দেশটি তাদের অতিরিক্ত মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে রাজি হয়েছিল, যাতে সেগুলো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তু না করে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শনী। রাজধানী তেহরানে অ্যারোস্পেস ফোর্স মিউজিয়ামে, ১২ নভেম্বর ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ওই কর্মকর্তার মন্তব্য দ্রুত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি ১৯৬৭ সাল থেকে চলে আসা জাপানের তিনটি পারমাণবিক নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নীতিগুলো হলো পারমাণবিক অস্ত্র না রাখা, তৈরি না করা এবং অন্য দেশের অস্ত্র নিজের মাটিতে জায়গা না দেওয়া।

তবে তাকাইচি এটাও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সাবমেরিন জাপানের বন্দরে ভিড়তে দেওয়া না হলে তা মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন নিয়ে জাপানের প্রকাশ্য বিতর্ক থেকে পিছপা হওয়া উচিত নয়।

জাপানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের এই ভাবনা তাদের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের জন্য একটি চরম অস্বস্তির বিষয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, জাপানের পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া মানে ‘বিশ্বের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনা’।

তাইওয়ান সংকটে জাপান জড়িয়ে পড়তে পারে—সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির এমন মন্তব্যের পর দেশটির সঙ্গে চীনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। এই পটভূমিতে জাপানের পারমাণবিক শক্তিধর হতে চাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের।

তাইওয়ান নিজেও একসময় পারমাণবিক অস্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিল। তবে ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তারা তাদের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষক রমেশ ঠাকুরের মতে, তাইওয়ান যদি এখন আবার পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে, তবে সেটি হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এতে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য চীন একটি মোক্ষম অজুহাত পেয়ে যাবে। তবে তাইওয়ানের এখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ‘সম্ভাবনা’ রয়ে গেছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও একসময় যা ছিল অবাস্তব কল্পনা, এখন সেখানেও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়টি নিয়ে সীমিত পরিসরে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ‘পারমাণবিক দৈত্য’কে কি আর বোতলে বন্দী করা সম্ভব? বেশি পারমাণবিক অস্ত্র মানেই ভুল–বোঝাবুঝি বা যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া—এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তা সত্ত্বেও এর কিছু ইতিবাচক দিক থাকতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ।

কাভানাঘের যুক্তি, নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করলে একটি রাষ্ট্র তার নিজের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে পারে না। এ কারণে তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রেখেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাইওয়ানের কট্টরপন্থীদের এটা বোঝানো, যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের পাশে আছে ভেবে তাঁরা যেন চীনের সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া না বাধান।

কাভানাঘের মতে, ‘নিরাপত্তার গ্যারান্টি বা প্রতিশ্রুতি আসলে স্থিতিশীলতার চেয়ে মার্কিন স্বার্থের বেশি ক্ষতি করে।’

আরও পড়ুন
ইরানের পুলিশের স্থাপনায় হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দেশটির একটি জাতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে। রাজধানী তেহরানে, ৪ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

তবে আমরা যদি একটি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাই, তবে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কাঠামো দরকার হবে। তা নতুন কোনো পারমাণবিক অস্ত্র রোধ-বিষয়ক চুক্তি (এনপিটি) হতে পারে, যেখানে পাকিস্তান বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কাঠামোর কাজ হবে দেশগুলোর পারমাণবিক মজুত তদারক করা। বিশেষ করে কোনো সন্ত্রাসী বা অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হাতে যাতে এই প্রযুক্তি না পৌঁছায়, সেই ঝুঁকি কমানো।

ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রহীন করা; কিন্তু তাদের পদক্ষেপ উল্টো ফল হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রাচুর্য বা নতুন এক যুগের সূচনাকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, ইরান আদৌ পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চেয়েছিল কি না, তা মোটেও পরিষ্কার নয়।

ইরান ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তিতে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে, সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা কমাতে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল, যা ছিল নজিরবিহীন।

বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্প ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পরিদর্শকেরা বারবার নিশ্চিত করেছেন, ইরান চুক্তির প্রতিটি শর্ত মেনে চলছে।

আইএইএর গত বছরের প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়েছিল, ‘ইরানে বর্তমানে কোনো অঘোষিত বা সুসংগঠিত পারমাণবিক কর্মসূচি চলার নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত নেই।’ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে একমত হয়েছিল। তাদের মতে, ‘ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।’

আরও পড়ুন

তবে গোয়েন্দারা এটাও বলেছিল, ইরান এমন কিছু কার্যক্রম চালিয়েছে, যা চাইলে খুব দ্রুত পারমাণবিক ডিভাইস তৈরির মতো সক্ষমতায় তাদের নিয়ে গিয়েছিল।

তেহরানের কর্মকর্তাদের মনোভাব সম্পর্কে রমেশ ঠাকুর ইরানের সাবেক একজন প্রেসিডেন্টের কথা স্মরণ করেন। ওই প্রেসিডেন্ট তাঁকে বলেছিলেন, গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা পারমাণবিক বোমা তাত্ত্বিকভাবে ইসলামবিরোধী। কারণ, এই অস্ত্র নির্বিচার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে, যারা যুদ্ধের মূল লক্ষ্যবস্তু নয়।

রমেশ ঠাকুর বলেন, ‘তাঁর যুক্তি ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহরা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, সেটার একটি সীমা আছে। কারণ, এই নিরাপত্তা বাহিনীই মূলত নিজেদের সুরক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে আগ্রহী।’

আর বর্তমান পরিস্থিতির পর সেই আগ্রহ অদূর ভবিষ্যতে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।