যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিক্ষা দিতে চাওয়া’ কে এই আলী লারিজানি

আলী লারিজানিছবি: রয়টার্স

কয়েক দশক ধরে আলী লারিজানি ছিলেন ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর শান্ত ও বাস্তববাদী মুখ। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর বই লিখেছেন এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তবে ১ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের ৬৭ বছর বয়সী এই সেক্রেটারির কথার ধরন বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে লারিজানি জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছেন।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লারিজানি লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী (ইসরায়েল) ইরানি জাতির হৃদয়ে আগুনে জ্বালিয়েছে। আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে দেব। আমরা জায়নবাদী অপরাধীদের ও নির্লজ্জ আমেরিকানদের তাদের কাজের জন্য অনুশোচনা করতে বাধ্য করব।’

লারিজানি আরও লিখেছেন, ‘ইরানের সাহসী সেনারা ও মহান জাতি কুখ্যাত আন্তর্জাতিক নিপীড়কদের এমন শিক্ষা দেবেন, যা তারা ভুলতে পারবে না।’

লারিজানি অভিযোগ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইসরায়েলি ফাঁদে’ পড়েছেন। লারিজানি এখন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তেহরানের সবচেয়ে বড় সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছেন।

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী পর্ষদের পাশাপাশি লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে তেহরানের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছেন।

ইরানের ‘কেনেডি পরিবার’

১৯৫৮ সালের ৩ জুন ইরাকের নাজাফের একটি ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেন লারিজানি। তিনি এমন এক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য যে ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁদের ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে অভিহিত করে। লারিজানির বাবা মির্জা হাসেম আমোলি একজন বিখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন।

লারিজানির ভাইয়েরাও ইরানের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিচার বিভাগ ও সর্বোচ্চ নেতা বাছাই ও তদারকির ক্ষমতা থাকা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’–এর সদস্যও।

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নিবন্ধন শেষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন দেশটির পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার আলী লারিজানি। তেহরান, ৩১ মে ২০২৪
ছবি: রয়টার্স

ইরানের ১৯৭৯–এর বিপ্লব–পরবর্তী অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গেও লারিজানির ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। ২০ বছরে বয়সে তিনি ফারিদেহ মোতাহারিকে বিয়ে করেন। ফারিদেহ ছিলেন মোরতেজা মোতাহারির মেয়ে। মোরতেজা ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

পরিবারের রক্ষণশীল ধর্মীয় শিকড়ের পরও লারিজানির সন্তানেরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর মেয়ে ফাতেমেহ তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক করেছেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষায়িত ডিগ্রি নেন। নিজের অনেক সহকর্মী পুরোপুরি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও গণিতবিদ ও দার্শনিক লারিজানির পড়াশোনা ধর্মনিরপেক্ষ ধারায়।

১৯৭৯ সালে লারিজানি শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিত ও কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পশ্চিমা দর্শনে মাস্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। তাঁর থিসিস ছিল জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর।

তবে লারিজানির রাজনৈতিক অবস্থানই তাঁর ক্যারিয়ারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি যৌথ মহড়া চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্য। ২১ ডিসেম্বর, ২০২১
ছবি: রয়টার্স

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর লারিজানি ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন। পরে সরকারি পদে স্থানান্তরিত হন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট আকবর হাসেমি রাফসানজানির সরকারের অধীন সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত লারিজানি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা–আইআরআইবির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। আইআরআইবিতে কর্মরত থাকার সময় সংস্কারপন্থীরা লারিজানির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, লারিজানির রক্ষণশীল নীতি ইরানি তরুণদের বিদেশি গণমাধ্যমের ভোক্তা হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে লারিজানি ইরানের পার্লামেন্টের (মজলিস) স্পিকার হিসেবে টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

নিরাপত্তা বিভাগে ফেরা

লারিজানি ২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন রক্ষণশীল প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে উঠতে পারেননি। একই বছর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক হিসেবে নিয়োগ পান।

তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পারমাণবিক নীতির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ায় ২০০৭ সালে লারিজানি এসব পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোম থেকে একটি আসন জিতে ২০০৮ সালে লারিজানি ইরানের পার্লামেন্টে (মজলিস) আসেন। তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পান। ফলে তাঁর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। তিনি পারমাণবিক বিষয়েও সম্পৃক্ততা বজায় রেখে ২০১৫ সালের ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যকার পারমাণবিক চুক্তি ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’‑পার্লামেন্টে অনুমোদন নিশ্চিত করেন।

২০২০ সালে সংসদের স্পিকার ও পার্লামেন্ট সদস্যের পদ ছাড়ার পর লারিজানি ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এবার তাঁকে প্রার্থিতা যাচাই করা সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিল অযোগ্য ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে আবার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

গার্ডিয়ান কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট পদে লারিজানির অযোগ্যতার কারণ প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্লেষকেরা ২০২১ সালের পদক্ষেপটিকে কট্টরপন্থী ইব্রাহিম রাইসির পথ সুগম করার উপায় হিসেবে দেখেছেন, যিনি সেই নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। লারিজানি ২০২৪ সালে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্তকে ‘অস্বচ্ছ’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

অবশ্য ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান লারিজানিকে আবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেন। এভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই পদে ফিরে আসেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই লারিজানির অবস্থানে অনমনীয়তা লক্ষ করা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে খবর আসে, লারিজানি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি বাতিল করেছেন। তিনি ঘোষণা দেন, সংস্থাটির প্রতিবেদনগুলো ‘আর কার্যকর নয়’।

যুদ্ধের মধ্যে কূটনীতি

কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও লারিজানিকে প্রায়ই বাস্তববাদী ও ইরানি শাসনব্যবস্থার ভেতরে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারেন। মূলত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তাঁর সমর্থনের কারণেই এমনটি মনে করা হয়।

বর্তমান উত্তেজনা বৃদ্ধির মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। ওমানের মধ্যস্থতায় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, তেহরান ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পায়নি। এ সময় তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তারা একটি ‘যুদ্ধ বাধানোর’ উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক পদক্ষেপকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি আলোচনার বিষয়ে তাঁর দেশের অবস্থানকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সে সময় তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে যে সামরিক পথ কোনো টেকসই সমাধান নয়। লারিজানি বলেন, আলোচনার পথ বেছে নেওয়াই একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।

তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা সেই কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

সর্বশেষ ভাষণে লারিজানি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নেতাদের হত্যা করে ইরানকে অস্থিতিশীল করা যাবে ভাবলে, সেটা হবে অলীক কল্পনা।

লারিজানি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আঞ্চলিক দেশগুলোতে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটিকে আমরা লক্ষ্যবস্তু করছি।’

খামেনি আর বেঁচে নেই এবং পুরো অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ সংকটের দ্বারপ্রান্তে। এমন পরিস্থিতিতে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘আগে কখনো দেখেনি এমন শক্তি’ দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।