ইরানে হামলা হলে ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’, যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি খামেনির

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিছবি: এএফপি

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেবে। আজ রোববার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানকে একটি পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করতে কিংবা বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন। এর জের ধরে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নৌ উপস্থিতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে খামেনি বলেন, ট্রাম্প নিয়মিত যুদ্ধজাহাজের ভয় দেখাচ্ছেন। এসব দেখে ইরানি জাতি ভীত হবে না, এসব হুমকিতে ইরানের জনগণ বিচলিত হওয়ার পাত্র নয়।

খামেনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধ শুরু করতে চাই না এবং কোনো দেশে আক্রমণের ইচ্ছাও আমাদের নেই। তবে যদি কেউ ইরানি জাতির ওপর হামলা চালায় কিংবা হয়রানি করার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওপর পাল্টা কঠোর আঘাত হানা হবে।’

বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ডেকে সারিবদ্ধ যুদ্ধবিমান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

কূটনৈতিক সমাধানের উপায় খোঁজা হচ্ছে

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরান জানিয়েছে, তারা ন্যায়সংগত আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে সেই আলোচনায় দেশটির প্রতিরক্ষাসক্ষমতা হ্রাসের কোনো শর্ত থাকা চলবে না।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি বিমানবাহী রণতরি এবং তিনটি উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে।

অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পরে তা ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর দেশটির জন্য সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। তবে ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে বর্তমানে বিক্ষোভের তীব্রতা কমে এসেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ অস্থিরতায় দেশটিতে ৩ হাজার ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ আজ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৭১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, খামেনি এই বিক্ষোভকে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রগুলোয় আঘাত হানা।

আলোচনায় অগ্রগতি

একদিকে ইরানের সামরিক প্রধান ওয়াশিংটনকে সামরিক হামলার বিষয়ে সতর্ক করছেন, অন্যদিকে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা গতকাল শনিবার দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে হামলার হুমকিও জারি রেখেছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি বলেন, গণমাধ্যমে যুদ্ধের প্রচারের বিপরীতে আলোচনার কাঠামোগত প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। লারিজানি মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর এ তথ্য জানিয়েছেন।

গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, বড় কোনো সংঘাত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হবে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে ফোনালাপে তিনি বলেন, ইরান কখনোই যুদ্ধ চায়নি এবং তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে যুদ্ধ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা এই অঞ্চলের কারও স্বার্থেই কাজে আসবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: রয়টার্স

পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘ইরান আমাদের সঙ্গে কথা বলছে। দেখা যাক আমরা কিছু করতে পারি কি না। অন্যথায় কী ঘটে, তা দেখা যাবে।’

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি শনিবার তেহরানে লারিজানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যাতে এই অঞ্চলে উত্তেজনা কমানো যায়।

এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছেন, তাঁর বাহিনী পূর্ণ সামরিক ও রক্ষণাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে আছে। তিনি বলেন, শত্রু যদি কোনো ভুল করে, তবে তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং এই অঞ্চল ও জায়নিস্ট শাসনামলের নিরাপত্তাকে নিশ্চিতভাবে বিপন্ন করবে।