ইরানকে পাঁচ দফা তালিকা দিল যুক্তরাষ্ট্র, রাজি নয় তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানছবি: কোলাজ

যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে আলোচনার জন্য ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ইরানের কয়েকটি সংবাদ সংস্থার বরাতে রোববার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। এদিকে দ্রুত চুক্তিতে রাজি না হলে ইরানকে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে পাকিস্তান ও অন্য মধ্যস্থতাকারীরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে জানান, তাঁর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদী। একই দিন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নকভি দুই দিনের সফরে তেহরানে পৌঁছেছেন। যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। এর কয়েক দিন পর পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ২০ ঘণ্টার বেশি বৈঠক করেন, কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এর পর থেকে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের চেষ্টা চলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান এরই মধ্যে পাল্টাপাল্টি একাধিক প্রস্তাব বিনিময় করেছে, কিন্তু প্রস্তাবের শর্ত পছন্দ না হওয়ায় এ পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসতে পারেনি।

এদিকে রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে সেখানকার একটি জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। তবে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোববার ইরান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে টেলিফোনে আলাপ করেছেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
এএফপি ফাইল ছবি

এদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। আধা ঘণ্টার বেশি এ ফোনালাপে ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরুর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং তাঁর সাম্প্রতিক চীন সফর সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে অবহিত করেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাঁচ দফা

ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ রোববার জানায়, ওয়াশিংটন পাঁচ দফার একটি তালিকা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরান কেবল একটি পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখতে পারবে। তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্থানান্তর করতে হবে।

ফার্স নিউজ জানায়, সর্বশেষ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জব্দ ইরানের সম্পদের অন্তত ‘২৫ শতাংশ’ ছেড়ে দিতেও রাজি হয়নি। তারা যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতেও অস্বীকার করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনা শুরু হলেই কেবল সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এদিকে ইরানের আরেক সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দৃশ্যমান ছাড় না দিয়েই এমন সব সুবিধা আদায় করতে চায়, যা তারা যুদ্ধের সময় অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবি আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ দফা নিয়ে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ইরান যা চায়

ইরান নিজের প্রস্তাবে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ এবং তাদের বন্দরে চলমান মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। ইরানের ওপর আবার হামলা চালানো হবে না—এ মর্মে তেহরান আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি চায়। বিদেশে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সব সম্পদ মুক্তি এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার চায় ইরান।

ফার্স নিউজ জানিয়েছে, ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে থাকবে।

বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। ইরান বলছে, এ প্রণালি দিয়ে কীভাবে নৌযান চলবে, তা নিয়ে তারা নতুন বিধিবিধান তৈরি করেছে। এতে টোল আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। এটা চূড়ান্ত হলে সবাইকে তা মেনে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এ অবস্থানের ঘোর বিরোধী।

ইরানের জাতীয় সেনা দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নেন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। তেহরান, ইরান, ১৭ এপ্রিল, ২০২৪
ছবি: রয়টার্স

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেকারচি রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন করে হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জানা উচিত, ইরানে আবার হামলা হলে তাঁর দেশের সম্পদ ও সামরিক বাহিনী নজিরবিহীন খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দেয়। গত সপ্তাহে ইরান এর জবাব দেয়। ইরানের জবাব নিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের এ প্রস্তাব তাঁর একদম পছন্দ হয়নি।

এর পর থেকে ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করার হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। চুক্তির বিষয়ে ইরানের নেতৃত্ব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। রোববার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নইলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ!

‘দ্বিতীয় দফা আলোচনা শান্তি বয়ে আনতে পারে’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার দ্য টাইমসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সরাসরি আলোচনা একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইরান ও মার্কিন প্রশাসন থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সব পক্ষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে পাকিস্তান।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাগের গালিবাফ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ১১ এপ্রিল, ২০২৬
রয়টার্স ফাইল ছবি

তেহরান সফরে থাকা পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিট বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার কারণে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, যা ছিল মূল্যবান ও প্রশংসনীয় একটি কাজ।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের মধ্যকার আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা নকভির তেহরান সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।