‘ইরাকে আগ্রাসনেরও প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি’

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের আয়োজনে পদযাত্রা। ইরানে হামলা বন্ধের দাবিতে প্ল্যাকার্ড এবং ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। ৭ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধের দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাজ্যে, মধ্য লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের দিকে পদযাত্রা করেছেন হাজারো মানুষ।

শনিবার বিকেলে ওয়েস্টমিনস্টারের কাছে মিলব্যাংকে জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। এরপর ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট (সিএনডি), স্টপ দ্য ওয়ার, প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইন, মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন, প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ইন ব্রিটেন এবং ফ্রেন্ডস অব আল-আকসার মতো সংগঠনগুলো দূতাবাসের দিকে এই পদযাত্রার নেতৃত্ব দেয়।

অনেক বিক্ষোভকারীর হাতে ছিল ইরান ও ফিলিস্তিনের পতাকা। এ ছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিও বহন করছিলেন অনেকে।

হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা ছিল—‘ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘ইরানে যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করো’ এবং ‘ইরানের ওপর যুদ্ধ নয়’।

ভক্সহলে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে ‘ইওর পার্টি’র সংসদ সদস্য জারা সুলতানা বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের ফের অবহেলা করা চলবে না।’

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক আগ্রাসন এবং স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের কথা স্মরণ করে তিনি উপস্থিত জনতাকে বলেন, ‘তখন আমাদের বলা হয়েছিল, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। আমাদের বলা হয়েছিল, এই যুদ্ধ ইরাকিদের রক্ষা করবে এবং বিশ্বকে নিরাপদ করবে। কিন্তু আসল সত্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

কভেন্ট্রি সাউথ এলাকার এই সাবেক লেবার এমপি আরও বলেন, ‘২৩ বছর আগে যখন আমরা ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে পদযাত্রা করেছিলাম, তখন আমাদের কথা শোনা হয়নি। আমাদের আর উপেক্ষা করা যাবে না। কারণ, ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে তারা (ইরাক) সঠিক ছিল। আজ আমরা শান্তি, ন্যায়বিচার এবং এমন এক বিশ্বের জন্য আওয়াজ তুলেছি, যেখানে সরকারগুলো অতীত থেকে শিক্ষা নেবে।’

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের পদযাত্রায় ইরানের সঙ্গে প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নেন যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। ৭ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তিনি বিক্ষোভে যোগ না দিলেও দূতাবাসের বাইরে জনতার উদ্দেশে তাঁর একটি বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০০৩ সালে আমরা লাখ লাখ মানুষ ইরাকে অবৈধ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। তবে আজ আমরা উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলতে এখানে জড়ো হয়েছি-ব্রিটেনকে যেন আরেকটি অবৈধ যুদ্ধে টেনে নেওয়া না হয়।’

বর্তমানে স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেরেমি করবিন তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিপর্যয়কর হস্তক্ষেপে যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে আসছে। আমরা এখানে ভিন্ন কিছু রক্ষা করতে এসেছি। আমরা এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি চাই, যা সহযোগিতা, সমতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিরকাল ধরে চলা যুদ্ধ কোনো খেলা নয়। বাস্তব জীবনে মানুষের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। তাই নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

এক পুলিশ কর্মকর্তা ধারণা দেন, শনিবার বিকেলের এই বিক্ষোভে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ যোগ দেন।

বিক্ষোভের সময় এক নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। লন্ডন পুলিশ এক্স–এ দেওয়া এক পোস্টে জানায়, প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে ‘জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর’ অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিক্ষোভ শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে একজনকে অস্ত্র রাখার জন্য এবং আরেকজনকে স্লোগানের মাধ্যমে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া মাইদা ভ্যালে ঘটা একটি ঘটনার জেরে সহিংস বিশৃঙ্খলার সন্দেহে ৩০ বছরের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই কর্মসূচির আগেই পুলিশ টহল জোরদার করেছিল। পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের একটি নির্ধারিত পথে থাকা এবং বিকেল ৫টার মধ্যে তাদের পদযাত্রা-পরবর্তী সমাবেশ শেষ করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার অবসানের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা যখন মার্কিন দূতাবাসের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন ইসরায়েলের পতাকা হাতে বেশ কয়েকটি দল মিলব্যাংকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। পদযাত্রা করে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলি পতাকা বহনকারীদের উদ্দেশে ‘খুনি’ বলে চেঁচিয়ে উঠছিলেন। এর জবাবে ইসরায়েলের পতাকাধারী কেউ কেউ বলেন, ‘আপনারা ভুল বলছেন’ এবং ‘আপনারা সত্য অস্বীকার করছেন’।

ইরানে হামলা বন্ধের দাবিতে লন্ডনে স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের পদযাত্রায় হাতে হাত রেখে ও ব্যানার নিয়ে এতে অংশ নেন যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। ৭ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

চলার পথে বিক্ষোভকারীদের মুখে স্লোগান ছিল– ‘আমরাই জনগণ। আমাদের চুপ করানো যাবে না। এখনই বোমা হামলা বন্ধ করো, এখনই, এখনই।’

এই মিছিলে ছিলেন লন্ডনে বসবাসরত ৩০ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান শিক্ষার্থী দানিলা কস্তা। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ইরান ও ফিলিস্তিন নয়, বরং কিউবা ও ভেনিজুয়েলার প্রতিও সংহতি জানাতে এখানে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সবকিছু স্বাভাবিক ভেবে দিন কাটাতে পারি না।’

দানিলা কস্তা আশা প্রকাশ করেন, এই বিক্ষোভ যুক্তরাজ্য সরকারকে বুঝিয়ে দেবে যে জনসমর্থন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পক্ষে নয়। সেটা অস্ত্র সরবরাহ করা হোক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হোক।

নর্দাম্পটনের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী মার্টিন পেরির কাছে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে চালানো কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এটি মূলত আমেরিকা ও ইসরায়েলের নেওয়া ধারাবাহিক কিছু সিদ্ধান্ত, যা আন্তর্জাতিক আইনকে ধ্বংস করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি আজ কিয়ার স্টারমারকে (যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী) এই বার্তা দিতে এখানে এসেছি যে জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের পক্ষে নয়। আমরা চাই না আমাদের বাহিনী কোনো অবৈধ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক।’

বিক্ষোভের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ২৮ মার্চ মধ্য লন্ডনে ‘কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে’ আরেকটি পদযাত্রা করবেন তাঁরা।