যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে আতঙ্ক ও উদ্বেগ
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানজুড়ে আতঙ্ক ও শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করায় বিভিন্ন শহরের গ্যাস স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
ইরানে গতকাল শনিবার কর্মসপ্তাহ শুরুর দিনই রাজধানী তেহরানে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে এবং আকাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তেহরানের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শুনেই তিনি সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে আসার জন্য পাগলের মতো ছুটেছেন।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর তাবরিজের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী মিনু টেলিফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমরা ভীষণ ভয় পাচ্ছি, আমরা আতঙ্কিত। আমার সন্তানেরা ভয়ে কাঁপছে। আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, আমরা এখানেই মারা যাব।’ তাবরিজসহ ইরানের আরও অনেক এলাকাতেই বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। মিনু আরও বলেন, ‘আমার সন্তানদের কী হবে?’
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদ জানিয়েছে, তারা তেহরানসহ অন্যান্য শহরে আরও হামলার আশঙ্কা করছে। তাই পর্ষদের পক্ষ থেকে জনগণকে আহ্বান জানানো হয়েছে, ‘সম্ভব হলে অন্য শহরগুলোতে চলে যান, যাতে এই দুই জান্তার আগ্রাসন থেকে আপনারা নিরাপদ থাকতে পারেন।’ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশটির সব স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দেশটির হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালায় ইসরায়েল। এই হামলায় নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে ৬০ জন।
কয়েক সপ্তাহ আগে দেশব্যাপী বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নে হাজারো মানুষের প্রাণহানির রেশ কাটতে না কাটতেই এই হামলার মুখে পড়ল ইরানিরা। এ ছাড়া মাত্র আট মাস আগেই ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং সেই সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা বর্ষণের ধকল সইতে হয়েছে দেশটিকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাঝুঁকি দূর হবে এবং এটি ইরানিদের জন্য তাদের শাসকদের হটানোর একটি সুযোগ তৈরি করবে। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (অপারেশন মহাকাব্যিক তর্জন)।
মধ্য ইরানের ইয়াজদ শহরের এক বাসিন্দা আশা প্রকাশ করে বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশে চালানো এই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। ইয়াজদের ওই বাসিন্দা বলেন, ‘ওদের বোমা ফেলতে দিন।’
তবে উত্তরাঞ্চলীয় শহর রাশতের বাসিন্দা সামিরা মোহেব্বি এই মতের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, ‘আমি এই শাসনের বিরোধী, তারা গোল্লায় যাক। কিন্তু আমি চাই না বিদেশি শক্তি আমার দেশে হামলা চালাক। আমি চাই না আমার ইরান ইরাকের মতো হয়ে যাক।’ সাদ্দাম হোসেনকে হটাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর প্রতিবেশী দেশ ইরাক বছরের পর বছর ধরে যে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের শিকার হয়েছে, সে প্রসঙ্গ টেনেই তিনি এ কথা বলেন।
‘তারা আমাদের আবারও ধোঁকা দিল’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্ট ভবনসংলগ্ন তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তাঘাট অবরোধ করে রেখেছে।
গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ দফার আলোচনায় কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এই হামলা শুরু হলো। যদিও ওমানি মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার উন্নতির কথা জানিয়েছিলেন।
তেহরানের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, ‘তারা বলেছিল পারমাণবিক আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তারা আবারও আমাদের ধোঁকা দিল।’
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে সন্দেহ করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যদিও তেহরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাধারণ মানুষ নগদ বৈদেশিক মুদ্রা (হার্ড কারেন্সি) কেনার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেছে। হামলার শিকার হওয়া আরেক শহর ইস্পাহানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাঁরা এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারছেন না।
৪৫ বছর বয়সী রেজা সাদাতী জানান, তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে তুরস্ক সীমান্তের কাছের শহর উরুমিয়েতে চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সীমান্ত খোলা থাকলে আমরা পার হয়ে ইস্তাম্বুল চলে যাব।’