দক্ষিণ ইরানে কেন বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের উপকূলবর্তী এলাকা ও হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত বন্দর আব্বাসের দৃশ্য। ১০ ডিসেম্বর ২০২৩ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাহিনী টানা ষষ্ঠ রাতের হামলা চালানোর পর তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন এখন বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে।

ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি রেলস্টেশন ও আবাসিক এলাকায় হামলা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য জায়গায় সেতু, পানির স্থাপনা, খাদ্যের গুদামসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো হামলার শিকার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ইরানের জ্বালানি খাতকে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু করবে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পরই নতুন এসব হামলা হয়। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি ‘জ্বালানি স্থাপনাগুলো সবার শেষের জন্য বাঁচিয়ে রাখবেন’।

উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ইরানের সামরিক বাহিনী গত শুক্রবার দাবি করেছে, তারা বাহরাইনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে যে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাব দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে চলতি সপ্তাহে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আবারও সক্রিয় করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের সূত্রপাত। পরে গত এপ্রিলে ঘোষিত একটি অস্ত্রবিরতির মেয়াদ বাড়াতে ও যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার একটি রূপরেখা তৈরি করতে মাসখানেক আগে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। তবে সেই সমঝোতা স্বাক্ষরের মাত্র এক মাসের মাথায় আবার নতুন করে এ লড়াই শুরু হলো। এর পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটন একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনছে।

সেন্টকমের প্রকাশিত ছবিতে সারোনিক কোরসেয়ার ড্রোন থেকে ইরানের একটি সাবমেরিন দেখা যাচ্ছে। ২৬ জুলাই ২০২৬
ছবি: সেন্টকম

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই নতুন এসব হামলা চালানো হয়। ওমান একটি নতুন নৌ চলাচল করিডরের ঘোষণা দেওয়ার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথে নৌযান প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। এর জবাবে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকাগুলোয় যাতায়াতকারী সব ধরনের জাহাজের ওপর আবারও নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

হামলাগুলো যতই বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত হানছে, ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে ততই প্রশ্ন উঠছে। এ হামলার লক্ষ্য আসলে কি ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করা? নাকি কোনো স্থল অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন নেটওয়ার্কগুলো ফাঁকা করে নেওয়া? নাকি দৈনন্দিন জীবন নির্ভরশীল, এমন অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো?

এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইন মেনে করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে যেমন বিতর্ক উসকে দিয়েছে, তেমনি এ সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নতুন করে ইরানের যেসব জায়গায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: প্রথম আলো গ্রাফিক্স

কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র হরমুজগান প্রদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অবকাঠামোগুলোর ওপর আঘাত হানছে। আবার দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় এলাকাগুলো বারবার মার্কিন হামলার শিকার হচ্ছে।

ইরানের আহভাজ, কেশম, বুশেহর, দশ্তি, বোস্তান, সিরিক ও বন্দর-ই লেঙ্গেহ এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের দফা হামলাগুলোর তুলনায় এবার অবকাঠামোর অনেক বেশি মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির পাশেই অবস্থিত ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি বন্দর আব্বাস।

ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, শহরের কাহুরেস্তান সেতু ও একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সংবাদে একটি রেলওয়ে স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শহরের পাশেই একটি যোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত হানা হয়েছে, যার ফলে আশপাশের এলাকাগুলোয় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

ইরানে নতুন করে হামলার দাবি করার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড একটি অজ্ঞাত স্থান থেকে ধোঁয়া ওঠার ভিডিও প্রকাশ করেছে। ১৬ জুলাই ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

দক্ষিণাঞ্চল কেন গুরুত্বপূর্ণ

সাম্প্রতিক হামলাগুলোর একটি বড় অংশ চালানো হয়েছে বন্দর আব্বাসকে কেন্দ্র করে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ শহর ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখার মূল ঘাঁটি।

হরমুজ প্রণালির পাশেই অবস্থিত এ বন্দর পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলোর একটি। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি এ প্রণালি দিয়ে হতো। ফলে বাণিজ্য থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই বন্দর আব্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিররাজ শিয়ার্স আল-জাজিরাকে বলেছেন, প্রচলিত সামরিক স্থাপনার বাইরে এ হামলার বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: রয়টার্স

অ্যালেক্স আলফিররাজ শিয়ার্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিন দিন যেমন হতাশ হয়ে পড়ছেন, তেমনই ক্রমেই বেপরোয়াও হয়ে উঠছেন। আমরা হয়তো কৌশলগত ঘাঁটিগুলোর পাশাপাশি খোদ ইরানের মূল ভূখণ্ডে একটি সীমিত আকারের স্থল অভিযানের প্রাথমিক প্রস্তুতির ধাপগুলো দেখতে পাচ্ছি।’

হামলাগুলো এখন সেতু ও যোগাযোগ রুটের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে পানির শোধনাগার, খাদ্য গুদাম ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর মতো স্থাপনাগুলোতেও। যুক্তরাষ্ট্র যদি দক্ষিণ ইরানে কোনো স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে, তবে এসব সম্পদ বা স্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবনের মতে, এ হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এটি ‘হয়তো কোনো স্থল অভিযানেরই পূর্বাভাস’। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই বাড়তে থাকা যুদ্ধংদেহী বক্তব্যগুলোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, হরমুজ প্রণালি ও ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।

সাইমন ম্যাবন আরও যোগ করেন, ‘তবে আমার মনে হয় না, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে। কারণ, এটি যেমন চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে, তেমনই হবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মূল্যায়নে একটি মস্ত বড় ভুল।’

ম্যাবনের মতে, এ পর্যায়ে হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত তেহরানের ওপর চাপ আরও তীব্র করা এবং তাদের ‘আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা’। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগের দফায় উত্তেজনা বৃদ্ধির পর শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ আবার কূটনৈতিক পথেই হেঁটেছিল।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই অধ্যাপক সতর্ক করে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালালেই যে ইরানি জনগণ তাদের সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাবে, এমনটি ভাবা ঠিক হবে না।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রকাশ করা ছবিতে হামলায় অংশ নেওয়া একটি যুদ্ধবিমান
ফাইল ছবি: এএফপি

ম্যাবন বলেন, উল্টো এ ধরনের আগ্রাসন তেহরানের সেই পুরোনো দাবিকেই আরও জোরালো করবে—ওয়াশিংটন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইরানের সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ম্যাবন আরও বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য কোনো নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে না।

ম্যাবন আরও বলেন, বরং ইরানিদের কাছে মনে হবে, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতো সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর চিরচেনা অভ্যাসে মেতে উঠেছে।

এই অধ্যাপক এ-ও সতর্ক করেছেন যে এ সংঘাত আরও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

সাইমন ম্যাবন বললেন, ‘আমরা ট্রাম্পের এমন সব কথাবার্তা শুনেছি, যা পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। যেখানে হামলার লক্ষ্যবস্তু সামরিক স্থাপনা থেকে এমন জায়গায় সরে যেতে পারে, যা ইরানের জনগণের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।’