পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব কি আসলেই একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সূচনা করল

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে), সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কাছবি: তুর্কি প্রেসিডেন্ট কার্যালয়

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত শুক্রবার একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি ন্যাটোর মতো একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠনের আলোচনা উসকে দিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

ইরানের সঙ্গে মার্কিন–ইসরায়েলি যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া এক অস্থির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই নতুন এই জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটল। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র বলে পরিচিত পারস্য উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর তেহরানের পাল্টা আঘাত মূলত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে। আর এ পরিস্থিতিই আরব দেশগুলোকে একটি বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।

পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ যৌথ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ন্যাটোর ‘অনুচ্ছেদ ৫’ যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির মতো এ ধরনের কোনো হামলার জবাবে জোটের দেশগুলো যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে ন্যাটোর ‘অনুচ্ছেদ ৫’ যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির মতো এ ধরনের কোনো হামলার জবাবে জোটের দেশগুলো যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কেন এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ

সংঘাত–বিক্ষুব্ধ এ অঞ্চলে তিনটি সুন্নি মুসলিম দেশের এমন সামরিক সহযোগিতা এক শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা দিচ্ছে।

সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এ ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তিনটি দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলভিত্তিক একটি নিজস্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও অবদান রাখবে।’

এ ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তিনটি দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলভিত্তিক একটি নিজস্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও অবদান রাখবে।
আবদুল আজিজ সাগের, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান

এ জোটের তিন অংশীদারেরই অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু নিজস্ব সম্পদ বা শক্তির জায়গা রয়েছে। যেমন পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম দেশ, যার পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে। তুরস্কের রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাশিল্প ও ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক বাহিনী। আর বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল আর্থিক শক্তি ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক সেনাবাহিনী।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করছেন। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা
ছবি: তুর্কি প্রেসিডেন্ট কার্যালয়

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে এ অঞ্চলে এমন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা এবারই প্রথম নয়। তাই সর্বশেষ এ চুক্তি যে রাতারাতি পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দেবে (গেমচেঞ্জার হবে), এমনটি না–ও হতে পারে।

এ জোটের তিন অংশীদারেরই অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু নিজস্ব সম্পদ বা শক্তির জায়গা রয়েছে। যেমন পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম দেশ, যার পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে। তুরস্কের রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাশিল্প ও ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক বাহিনী। আর বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল আর্থিক শক্তি ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক সেনাবাহিনী।

নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য–বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ মুদাসসির কামার আরটিকে বলেন, ‘আমি এটিকে “ইসলামিক ন্যাটো” বা একটি নতুন নিরাপত্তা ব্লক কিংবা নতুন কোনো জোট বা মেরুকরণ বলার মতো পর্যায়ে যাব না।’

মুহাম্মদ মুদাসসির কামার উল্লেখ করেন যে অতীতেও এই ধরনের জোট গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে।

‘মক্কা চুক্তি’র পেছনে কী

কয়েক মাসের আলোচনার পর এই ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তি ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন চুক্তি আলো দেখল।

সৌদিদের জানা উচিত যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কাগজের চুক্তি’ তাদের নিরাপত্তা এনে দেবে না। ঠিক যেভাবে বছরের পর বছর ধরে মার্কিনদের একতরফা তোষামোদ করেও তারা নিরাপত্তা পায়নি।

সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি রিয়াদকে একটি পারমাণবিক শক্তি–সমর্থিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সমীকরণ নতুন করে সাজাচ্ছে, তখন এটি সৌদির জন্য বড় শক্তির জায়গা।

ইতিমধ্যে পাকিস্তানের কয়েক হাজার সেনা, ১৬টি যুদ্ধবিমান, ড্রোন, এমনকি চীনে তৈরি একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থান করছে। আবার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে আগে থেকেই তুর্কি ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র গত বছর ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্য নষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও ইরান ও তার সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে বেশ চিন্তায় ফেলেছে।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেওয়া নিয়ে বেশ উদ্বেগে রয়েছে তুরস্ক। মূলত ইরান সরকারকে উৎখাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক পরিকল্পনার একটি অংশ ছিল এটি।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলে একটি বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্য রয়েছে পাকিস্তানের।

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই অনুষ্ঠানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ তিন দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ৭ আগস্ট ২০২৬, মক্কা
ছবি: তুর্কি প্রেসিডেন্ট কার্যালয়

অন্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় থাকা ও পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ইরান এই চুক্তিকে ‘কাগজের চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্ট এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘সৌদিদের জানা উচিত যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজের চুক্তি তাদের নিরাপত্তা এনে দেবে না। ঠিক যেভাবে বছরের পর বছর ধরে মার্কিনদের একতরফা তোষামোদ করেও তারা নিরাপত্তা পায়নি।’

পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক ও ইসলামাবাদের প্রতি তুরস্কের সমর্থনে অসন্তুষ্ট ভারতও এ পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি (মক্কা চুক্তি সই) খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি এবং আপনাদের এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানাব।’

আরও পড়ুন

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুদাসসির কামারের মতে, এ নতুন প্রতিরক্ষা জোট এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বা প্রতিরক্ষা সমীকরণে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

এই অধ্যাপক আরও উল্লেখ করেন, ‘এই চুক্তির ফলে আগামী বছরগুলোয় ভারতের জন্য আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে।’ তবে রিয়াদের সঙ্গে নয়াদিল্লির গভীরতর হতে থাকা সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে বলে দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন