নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধের শেষ চাননি, হামাসের কাছে বন্দীদের মুক্তিতেও অনাগ্রহী ছিলেন: ইসরায়েলের সাবেক আলোচক

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়া হুফাইলছবি : রয়টার্স

ইসরায়েল চাইলে গাজা থেকে আরও ‘অনেক আগেই জিম্মিদের মুক্ত করে আনার চুক্তি করতে পারত’; এতে সেখানে নিহত হওয়া বা খুন হওয়া ইসরায়েলি জিম্মিরা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক এক আলোচক।

বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে বলেও মনে করেন দেশটির অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নিৎজান অ্যালন। গাজা যুদ্ধের শুরুতে জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে আলোচনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

গাজা যুদ্ধ শুরুর দুই বছরের বেশি সময় পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি চুক্তির মাধ্যমে গাজায় হামাসের হাতে জিম্মি ইসরায়েলিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

নিৎজান অ্যালন গত শুক্রবার বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা এই পর্যায়ে আরও অনেক আগেই পৌঁছাতে পারতাম—সম্ভবত এক বছর বা তার আগেই। এতে যুদ্ধের অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে বড় কোনো প্রভাব পড়ত না। আমরা আসলে সেই সুযোগ হারিয়েছি। যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ হয়েছে।’

আমার মনে হয়, আমরা এই পর্যায়ে আরও অনেক আগেই পৌঁছাতে পারতাম—সম্ভবত এক বছর বা তার আগেই। এতে যুদ্ধের অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে বড় কোনো প্রভাব পড়ত না। আমরা আসলে সেই সুযোগ হারিয়েছি। যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ হয়েছে।
— নিৎজান অ্যালন, ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল

অ্যালন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির এক ওয়েবকাস্টে এসব কথা বলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই ওয়েবকাস্টের আয়োজন করা হয়। ওই হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

চুক্তিতে সই করার আগে ইসরায়েলকে ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন করতে হবে—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই দাবি ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেন অ্যালন।

অ্যালন ২০২৫ সালের অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এরপর হামাসের সামরিক সক্ষমতা কমেছে। তবে তিনি এও বলেন, যুদ্ধবিরতিটি আরও অনেক আগেই কার্যকর করা সম্ভব ছিল। তাহলে বন্দিদশায় নিহত বা খুন হওয়া কয়েকজন জিম্মি হয়তো জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরতে পারতেন।

কয়েকজন ইসরায়েলি সেনার সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাস ও ইসরায়েল বন্দিবিনিময় করে। এ চুক্তির অধীন ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনিকে এবং গাজায় আটক ২০ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি বলেছিলেন, এমন কি হামলার পরপরই সব জিম্মিকে মুক্তির বিনিময়ে সীমিত সময়ের যুদ্ধবিরতির জন্য হামাসের দেওয়া প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করতেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ‘রাজি হননি’।

যুক্তরাষ্ট্রের ওই থিঙ্কট্যাংক আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অ্যালন আরও বলেন, ‘আমরা যুদ্ধটা সংক্ষিপ্ত করতে পারতাঙ্‌–আমাদের এটা করা উচিত ছিল। তাহলে সব জিম্মিকে হয়তো এক বছর আগেই ফিরিয়ে আনতে পারতাম। এরপর সামনে এগিয়ে যেতে পারতাম এবং হয়তো উভয় পক্ষের হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাতে পারতাম।’

গত জুলাইয়েও অ্যালন একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। সে সময় তিনি ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচেরও সমালোচনা করেন।

অ্যালন বলেছিলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব করা কয়েকটি চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন স্মোৎরিচ। তাই সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব তিনি দাবি করতে পারেন না।

আরও পড়ুন

‘শুধু সুযোগ হারানো নয়, এটি মর্মান্তিক’

গত শুক্রবার আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক অ্যালান পিঙ্কাস বলেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধের শেষ হওয়া আটকে রেখেছিলেন।

অ্যালান বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পরপরই একটি চুক্তি করা সম্ভব ছিল। জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে প্রায় দুই বছর লেগেছে। তাই এটি শুধু একটি সুযোগ হারানো নয়, এটি মর্মান্তিক।’

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পরপরই একটি চুক্তি করা সম্ভব ছিল। জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে প্রায় দুই বছর লেগেছে। তাই এটি শুধু একটি সুযোগ হারানো নয়, এটি মর্মান্তিক।
—অ্যালান পিঙ্কাস, ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক

চলতি সপ্তাহের শুরুতে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি বলেছিলেন, এমন কি হামলার পরপরই সব জিম্মিকে মুক্তির বিনিময়ে সীমিত সময়ের যুদ্ধবিরতির জন্য হামাসের দেওয়া প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করতেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ‘রাজি হননি’।

পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ মোহাম্মদ আল-থানি আরও বলেন, ‘প্রথম দিনই আমরা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। আমাদের বার্তা ছিল খুবই স্পষ্ট। [হামাস নেতারা] বেসামরিক লোকজনকে বের করে আনার জন্য যুদ্ধবিরতির একটি সুযোগ চেয়েছিলেন। মূলত [ইসরায়েলিরা] এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতেই আগ্রহী ছিল না।’

গত মাসে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজের একটি প্রতিবেদন নিয়েও ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহুকে আগেই সতর্ক করেছিলেন।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবন
ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

যুদ্ধের অবসানে বাধা দেওয়া ও জিম্মিদের আরও আগে ফিরিয়ে আনতে নেতানিয়াহুর ‘অনাগ্রহ দেখানো’ নিয়ে মেজর জেনারেল অ্যালনের সর্বশেষ এ মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন দোরগোড়ায়।

২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

পিঙ্কাস বলেন, অ্যালনের মন্তব্য নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। কারণ, জনমত জরিপগুলোতে হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গত মাসে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজের এক প্রতিবেদন নিয়েও ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহুকে আগেই সতর্ক করেছিলেন।

নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ওই প্রতিবেদনের কারণে সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে মামলা করবেন। তিনি প্রতিবেদনটিকে ‘মনগড়া’ ও ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।

আরও পড়ুন