যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্ভাব্য চুক্তি
হরমুজ খুললে স্বস্তি ফিরবে এশিয়ায়
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হলে তা এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সাময়িক স্বস্তি বয়ে আনবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এশিয়া অঞ্চলটিই কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা সবচেয়ে বেশি সহ্য করেছে। তা সত্ত্বেও, এই সংকটের তীব্র প্রভাব চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এবং সম্ভবত তারপরও স্থায়ী হতে পারে।
গত সাড়ে তিন মাসে এশিয়াজুড়ে মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের অচলাবস্থায় শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করেছে। এই সংকটের মূল কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের ওপর এশিয়ার অতিরিক্ত নির্ভরতা। এই নৌপথ দিয়ে জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। আর তা সাধারণত এশিয়ার দেশগুলোতে আসে।
গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে এই প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবিলম্বে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী শুক্রবার এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
হরমুজ আবার খুলে দেওয়ার চুক্তিটি কার্যকর হলে তা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে। এর ফলে তেল, গ্যাস ও জ্বালানিজাত উপজাত পণ্য বোঝাই শত শত ট্যাংকার মুক্ত হবে এবং এশিয়ার বন্দরগুলোর উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা শুরু করতে পারবে। তবু শিল্পবিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, বাণিজ্যপ্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজার স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লাগবে।
জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ভাইস চেয়ারম্যান জোশুয়া এনগু এশিয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভালো খবর হলো, প্রণালিটি খুলে গেলে কিছু তেল-গ্যাস ফিরে আসবে।’ তবে তিনি যোগ করেন, খারাপ খবর হলো, তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি জ্যামিতিক হারে বেড়েছে এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলকে আরও বিপর্যস্ত করেছে।’
গত সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অঞ্চলটির বাজারগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারের সূচক প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি এক্সে লিখেছেন, চুক্তিটি সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ।
এক যৌথ বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেছেন, চুক্তিতে হরমুজ আবার খুলে দেওয়া এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকায় তাঁরা সন্তুষ্ট।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ধনী অর্থনীতির দেশ প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে তাদের বিশাল তহবিল এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহার করেছে। তবে এই শিল্পোন্নত পরাশক্তিগুলোও তেলের আকাশচুম্বী দামের কারণে হিমশিম খেয়েছে, যা তাদের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
সরবরাহ-শৃঙ্খলের জট দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি হয়েছে বৈশ্বিক সার সরবরাহের ক্ষেত্রে। পাঁচটি প্রধান রপ্তানিকারক দেশ—ইরান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন—যৌথভাবে বিশ্বের ইউরিয়া সারের এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরবরাহ করে। এ সংকট ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বড় অংশে ফসল বোনার মূল মৌসুমকে (যা মে থেকে জুলাই পর্যন্ত চলে) ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালবার্ট পার্ক বলেন, এক মাস সংকট সামলানো সম্ভব। কিন্তু এটি ফসল বোনার মৌসুমের অনেক গভীরে চলে গেলে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করবে।
এ ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীরা ন্যাপথার–ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছেন; এটি অপরিশোধিত তেল শোধনের একটি পেট্রোকেমিক্যাল উপজাত, যা প্লাস্টিক র্যাপ এবং খাবারের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়।
জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি সংস্থার উপদেষ্টা হারুহিকো সাকাইনো বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চালান আবার শুরু হওয়ার পর ন্যাপথার সরবরাহ-শৃঙ্খল স্বাভাবিক করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে।