সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন ইরানের আরাগচি, হুতিদের নিয়ে কী কথা হলো দুজনের
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের রিয়াদে বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরবের তাঁর প্রতিপক্ষ প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদকে ফোন করেছেন। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এই খবর দিয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেন।
গতকাল রোববার টেলিগ্রামে এক বার্তায় আরাগচি জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক সমাধানকে উপেক্ষা করে সামরিক পদ্ধতির ওপর জোর দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অঞ্চলের সংকটগুলোর কোনো সামরিক সমাধান নেই। গত সপ্তাহে আরাগচি বলেছিলেন, মার্কিন যুদ্ধের ‘কোনো সামরিক সমাধান নেই’। আরাগচি যোগ করেন, ‘কেবল ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে আলোচনাই’ এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে।
আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করতে ইরান প্রয়োজনীয় যেকোনো সাহায্য দিতে প্রস্তুত।
রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক দফা প্রাণঘাতী হামলায় এ পর্যন্ত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইয়েমেনে মার্কিন ভূমিকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন। তিনি ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
এসব মন্তব্য বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের করা মন্তব্যের বিপরীত। তখন তিনি বলেছিলেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করবে না।
দীর্ঘদিনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও ইরান ও সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকে রয়েছে এবং ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তির অধীনে পুনর্বহাল করা দূতাবাসগুলো চালু রয়েছে। সেই যুগান্তকারী চুক্তির আগে, সাত বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধকে উসকে দিয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন চালায়। এর পর থেকে তেহরানের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এই হামলার পর, তেহরান এবং তাদের মিত্ররা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক সম্পদ এবং অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রও রয়েছে।
গত মার্চে প্রিন্স ফয়সাল ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে তাদের হামলার সহ্যসীমা সীমিত। তিনি তেহরানকে তাদের কৌশল ‘পুনর্বিবেচনা’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সৌদিকে কী প্রস্তাব দিয়েছে ইরান
দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিফোনে কথা বলেছেন। তবে এই আলোচনা কে শুরু করেছিলেন বা সৌদি আরব কি ইরানকে হস্তক্ষেপ বা মধ্যস্থতা করতে বলেছিল, নাকি ইরান নিজে থেকেই এই প্রস্তাব দিয়েছিল—তা স্পষ্ট নয়। সৌদি আরব এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কি না, তা–ও অস্পষ্ট।
তবে জানা গেছে, ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের এই অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের জন্য বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর না করে, ইয়েমেন এবং অন্যান্য স্থানের নিরাপত্তার বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইরানি ভাষ্যে এর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া।
সুতরাং এই প্রস্তাবটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের ধারাবাহিক অবস্থানের সঙ্গেই মিলে যায়।
এটি মাঠপর্যায়ে কোনো বাস্তবায়নে রূপ নেবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়।
সৌদি আরব ইরানের এ প্রস্তাবটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারে। কারণ, তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হুতিদের ওপর ইরানের প্রভাব রয়েছে। তবে তারা এটিকে একটি রাজনৈতিক খেলা হিসেবে খারিজও করে দিতে পারে। তাদের যুক্তি হতে পারে, ইরানের মধ্যস্থতা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের কেবল হুতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই চলবে।
রিয়াদের অবস্থান শুরু থেকেই এমন ছিল, সৌদি আরবে হুতিদের হামলা বন্ধ করার ক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।
ইরান অবশ্য তাদের পক্ষে এ ধরনের প্রভাব থাকার কথা অস্বীকার করে জোর দিয়ে বলেছে, হুতিরা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়।
সুতরাং সৌদি আরবের জন্য এই মধ্যস্থতা গ্রহণ এবং ইরানের পক্ষে হুতিদের থামানো, দুটিই মুখের কথার চেয়ে বাস্তবে রূপ দেওয়া বেশ কঠিন।