যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হচ্ছে: ইরান

তেহরানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর মানুষ পতাকা উড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে, ৮ এপ্রিল ২০২৬ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান। আজ বুধবার দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে ভিত্তি করে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে।

তেহরানের এই ঘোষণার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছিলেন, সেটির বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত করছেন। যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহ ইরানের ওপর হামলা বন্ধ রাখবে। ট্রাম্প তখন আরও বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে অবিলম্বে ‘পুরোপুরি ও নিরাপদে’ খুলে দিতে রাজি হয় কি না, তার ওপর এই যুদ্ধবিরতি নির্ভর করছে।

গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান আংশিকভাবে এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দেয়।

ইরানের পাল্টা হামলার ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়। এমন অবস্থায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।

ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সব সামরিক লক্ষ্য ‘পূরণ করেছে এবং ছাড়িয়ে গেছে’। ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শান্তিচুক্তির দিকে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই এগিয়ে গেছে।

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছে এবং এটি ‘আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি’ হতে পারে বলে মনে করছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রায় সব বিরোধপূর্ণ বিষয়ে একমত হয়েছে এবং চুক্তিটি ‘চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন ও কার্যকর’ করার জন্য দুই সপ্তাহ সময় যথেষ্ট হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কথা বলতে গিয়ে তেহরানের সম্মতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করা হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ করবে।’

আরাগচি আরও বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল সম্ভব হবে। ট্রাম্প ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের সাধারণ রূপরেখাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নেওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলো ‘তাত্ক্ষণিকভাবে সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত।

শাহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, এ সিদ্ধান্ত ‘তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর’ হচ্ছে।

শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, সব বিরোধ চূড়ান্তভাবে সমাধানের জন্য আরও আলোচনা করা এবং একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ১০ এপ্রিল তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তথ্যমতে, তাদের ১০ দফা প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রাধান্য এবং তদারকির দাবি রয়েছে, যা দেশটিকে একটি ‘বিশেষ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান’ দেবে।

প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব ‘যুদ্ধরত বাহিনীকে’ ঘাঁটি থেকে প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ‘পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া প্রস্তাবে বিদেশে জব্দ করে রাখা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অনুমোদন করানোর কথাও বলা হয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, তেহরান আলোচনায় সম্মত হলেও মার্কিনপক্ষের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ অবিশ্বাস কাজ করছে। এ আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহ সময় রাখা হয়েছে এবং পক্ষগুলোর সম্মতিতে এই সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

পরিষদ আরও বলেছে, যদি শত্রুপক্ষ ‘সামান্যতম ভুল’ করে, তাহলে ‘পূর্ণ শক্তি’ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে ইরান প্রস্তুত আছে।

এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।