ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা: বিশ্বনেতারা কে কী বললেন

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে লাখো মানুষ। ১ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলা এবং এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি আক্রমণে উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো সতর্ক করেছে, এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।

গত শনিবার ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘বড় ধরনের সামরিক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইসরায়েল এই অভিযানকে ‘প্রতিরোধমূলক আক্রমণ’ বলেছে। হামলার পর ট্রাম্প ইরানের সাধারণ জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এবং সরকারি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন।

পরে ট্রাম্প জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে এই হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোয় পাল্টা হামলা শুরু করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তারা এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘ট্রুথফুল প্রমিজ ৪’।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা হুমকি-ধমকি ও আলোচনার মধ্যে এই সংঘাত শুরু হলো।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও কুয়েতে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটি এই হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেছে।

এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, ‘ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পুরো অঞ্চলে ইরানের আক্রমণ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।’

গুতেরেস বলেন, ‘আমি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছি। তা না হলে এ অঞ্চলে আরও বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে।’

নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় শনিবার বিকেলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বৈঠকে বলেন, সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এই হামলা চালানো হয়েছে।

তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর একটি বিস্ফোরণস্থল থেকে ধোঁয়া উঠছে। ১ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ওয়াল্টজ আরও বলেন, মিত্র দেশগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে—এমন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় অস্থিরতা তৈরিতে ব্যবহৃত নৌসম্পদ অকার্যকর করাই এর উদ্দেশ্য। এ ছাড়া প্রক্সি মিলিশিয়াদের কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর পথ বন্ধ করা এবং ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে বিশ্বকে হুমকি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, ‘ইসরায়েল, আমাদের মিত্র দেশগুলো এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর যে হুমকি তৈরি হয়েছিল, তা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইসরায়েল এই পদক্ষেপ নিয়েছে।’

ড্যানন আরও বলেন, ‘যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী “ইসরায়েল ধ্বংস হোক” বা “যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক” বলে স্লোগান দেয়, তখন আমরা সেটাকে হালকাভাবে নিই না। আমরা তাদের কথা বিশ্বাস করি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। আমাদের লক্ষ্য একেবারেই পরিষ্কার।’

ইরানের বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের ওপর আজ যে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তার ফলে ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। এ সংঘাত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

মস্কো এর আগে বিশ্ববাসীর কাছে একটি জোরালো দাবি জানিয়েছিল। তারা বলেছিল, যারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নষ্ট করতে চাইছে, তাদের এই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড’ যেন সবাই ভালোভাবে খতিয়ে দেখে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার মধ্যস্থতা করছিলেন। এই হামলার ঘটনায় তিনি ‘মর্মাহত’ হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বদর আল বুসাইদি লেখেন, ‘চলমান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আবারও ভেস্তে গেল।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যও ভালো হবে না, আর বিশ্বশান্তির জন্যও না। আমি যুক্তরাষ্ট্রকে এ সংঘাতে আর না জড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। এটি আপনাদের যুদ্ধ নয়।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ হামলাকে ‘সম্পূর্ণ উসকানিমূলক, অবৈধ ও অন্যায্য’ বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ (ইসরায়েল আগে) নীতিতে পরিণত করেছেন। এর অর্থ হলো ‘আমেরিকা লাস্ট’ বা আমেরিকাকে সবার শেষে রাখা।

আরও পড়ুন
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদ জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন এক নারী। ১ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

এদিকে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান ও কুয়েতে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটি এই হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেছে।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সৌদি আরব ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে এবং তাদের প্রতি অবিচল সমর্থন জানাচ্ছে। হামলার জবাবে এ দেশগুলো কোনো পদক্ষেপ নিলে সৌদি আরব নিজের সবটুকু সক্ষমতা দিয়ে তাদের পাশে থাকতে প্রস্তুত।’

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে ‘আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে’ আহ্বান জানিয়েছেন।

লন্ডনে জার্মান দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই তিন দেশ ধারাবাহিকভাবে ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এ ছাড়া বিবৃতিতে ইরানকে ‘অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড’ থেকে বিরত থাকতে এবং নিজ দেশের জনগণের ওপর ‘ভয়াবহ সহিংসতা ও দমন–পীড়ন’ বন্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ইরানের ওপর আজ যে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তার ফলে ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে গেছে। এ সংঘাত ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে
ভাসিলি নেবেনজিয়া, জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত

বিবৃতিতে তিন দেশের নেতারা বলেন, ‘আমরা এসব হামলায় অংশ নিইনি।’ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, ‘আমরা ইরানের নেতৃত্বকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত ইরানের জনগণকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিতে হবে।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আজ ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান মোতায়েন ছিল। তবে তিনি পরিষ্কার করেছেন, এই বিমানগুলো কোনো আক্রমণে অংশ নেয়নি। বরং ‘আমাদের জনগণ, স্বার্থ ও বন্ধুদেশগুলোকে রক্ষার জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা অভিযানের অংশ হিসেবে এটি করা হয়েছে।’

এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা হলে তা সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে উত্তেজনা বাড়তে থাকা ‘সবার জন্যই বিপজ্জনক’। মাখোঁ আরও বলেন, ‘আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশগুলো যদি অনুরোধ করে, তবে তাদের রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সব শক্তি মোতায়েন করতে ফ্রান্স প্রস্তুত আছে।’

আরও পড়ুন
তেহরানের এঙ্গেল্যাব স্কয়ারে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে সাধারণ মানুষের শোক। ১ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

জার্মানি বলেছে, হামলার বিষয়ে তাদের আগেই জানানো হয়েছিল। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যায়িত করেছেন। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইইউ ইরানের ওপর আগেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং পারমাণবিক ইস্যুসহ সব বিষয়ে কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়টিকে সমর্থন দিয়েছে।

কাজা কালাস বলেন, তিনি ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এখন সবচেয়ে জরুরি।’

আরও পড়ুন

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দপ্তর বলেছে, উত্তেজনা কমাতে তারা মিত্র ও আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। এদিকে ব্রাজিল সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়—সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপকে তাঁর দেশ সমর্থন করছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে বিবেচনাশক্তি না হারিয়ে উত্তেজনা কমানোর এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার অনুরোধ করেছেন।

ফলকার টুর্ক বলেন, ‘যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে সব সময় সাধারণ মানুষকেই চরম মূল্য দিতে হয়।’ তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে মনে করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়।

আরও পড়ুন