যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ছাড় দিতে রাজি ইরান
ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী বলেছেন, চুক্তিতে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির জন্য ছাড় দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত ইরান। এ জন্য ওয়াশিংটনকে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আলোচনায় আগ্রহী থাকতে হবে। তবে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। আজ রোববার সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী মজিদ তাখত রাভানচি।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চলমান উত্তেজনার মধ্যে সম্প্রতি পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাটে আলোচনায় বসেছিল দুই দেশ। আগামীকাল মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন মজিদ তাখত। বিবিসিকে তিনি বলেন, প্রথম ধাপের আলোচনা কমবেশি ইতিবাচক দিকে এগিয়েছে। তবে কতটুকু সফল হয়েছে, তা বলার সময় আসেনি।
দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় যোগ দিতে আগামীকাল সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবেন বলে গত শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে একটি সূত্র। এ বৈঠকের মধ্যস্থতা করবে ওমানের একটি প্রতিনিধিদল। প্রথম বৈঠকের ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
গত সোমবার ইরানের পরমাণুপ্রধান বলেছিলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয়, তাহলে নিজেদের কাছে থাকা সবচেয়ে পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমাতে রাজি তাঁরা। ইরান যে চুক্তির বিষয়ে নমনীয় অবস্থানে আছে, তা বোঝাতে বিবিসির কাছে পরমাণুপ্রধানের ওই বক্তব্য তুলে ধরেন মজিদ তাখত। তবে তিনি বলেন, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বাদ দেবে না।
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে পরমাণু অস্ত্র বানাতে চায় ইরান। যদিও তেহরান তা বরাবরই নাকচ করে আসছে। এ নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমাদের একটি চুক্তি ছিল। তাতে বলা হয়েছিল, তেহরান নিজেদের পরমাণু প্রকল্প সীমিত করার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। তবে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় বসে ২০১৫ সালে ওই চুক্তি থেকে সরে যান ট্রাম্প।
ইরানের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে প্রস্তুত রেজা
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ উত্তেজনা শুরু ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়া ওই বিক্ষোভ জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলে। বিক্ষোভকারীরা সরকার পতনে সক্ষম না হলেও তা সফল করতে একের পর এক হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরানের সাবেক শাহর ছেলে রেজা শাহ পাহলভিও বিক্ষোভের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন।
রেজা শাহ পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রয়েছেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছেড়েছিলেন তিনি। শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়াটাই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’। এ বক্তব্যের পর শনিবার জার্মানির মিউনিখে এক সমাবেশে পাহলভি বলেন, তিনি ইরানে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার জন্য নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত আছেন।
শনিবার মিউনিখে প্রায় দুই লাখ সমর্থকের সামনে বক্তব্যে পাহলভি বলেন, ‘একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতে পাড়ি দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে আমি এখানে এসেছি। আপনাদের জন্য রূপান্তরের নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ, যেন একদিন আমরা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ পাই।’
এ সময় উপস্থিত জনতা ‘জাভিদ শাহ’ (শাহ দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগান দিচ্ছিলেন। তাঁরা সিংহ ও সূর্যের ছবিযুক্ত সবুজ, সাদা ও লাল রঙের পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। পতাকার ছবিটি ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতীক। ওই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ৬২ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক সাইদ। তিনি এএফপিকে বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি মৃত শাসনব্যবস্থা। এর অবসান হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র–কানাডায় বিক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডাউনটাউন থেকে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মল পর্যন্ত বিভিন্ন সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ শনিবার বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁরা ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। বিক্ষোভ হয়েছে কানাডাতেও। শনিবার কানাডার টরন্টোয় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘ট্রাম্প, এখনই পদক্ষেপ নিন।’
ইরানের বিক্ষোভ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। সেখানে আরও একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মিউনিখ সম্মেলনে জড়ো হওয়া সাংবাদিকদের পাহলভি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলছি,…ইরানের মানুষ আপনাকে বলতে শুনেছে যে তাদের জন্য সাহায্য আসছে। আপনার ওপর তাদের আস্থা আছে। তাদের সাহায্য করুন।’