ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিন যেভাবে ইরানের ওপর হামলা চালাল
ধরা হয়েছিল, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইরান সরকার কষ্টকর কিছু শিক্ষা পেয়েছিল।
সেই সংঘাতে ইসরায়েল ইরানের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও কমান্ডারকে ভূগর্ভস্থ গোপন আস্তানায় খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। পরে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তাঁদের দেহরক্ষীরা মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন বলেই ইসরায়েল তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছিল।
ইরান ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এ ধরনের ব্যর্থতায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
কিন্তু এই সপ্তাহান্তে ইরান যেসব মারাত্মক ভুল করেছে, তা গত জুনের চেয়েও মারাত্মক ছিল। ফলে এবারের হামলায় দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অনেকেই ধারণা করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কিংবা উভয় দেশ ইরানে হামলা চালাতে পারে। ঠিক এমন একটা সময়ে গত শনিবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কয়েকজন দিনের বেলায় মাটির ওপরে, তাঁদের পরিচিত ঠিকানা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করতে জড়ো হয়েছেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও মাটির ওপরে তাঁর সরকারি বাসভবন কম্পাউন্ডে অবস্থান করছিলেন, যা মোটেই গোপন নয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ওই সব নেতা কোথায় থাকবেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা সেটা কীভাবে জানলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ওই তথ্য ও ইরান থেকে সংগৃহীত অন্যান্য সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে দুই দেশ তিন দফা হামলা চালায়। এতে ইরানের উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। দ্রুতই তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়।
এরপর শুরু হয় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র অনুসন্ধান ও ধ্বংসের অভিযান। এতে ইরানে গোলাবারুদ, লঞ্চার, ক্রু, গুদাম, উৎপাদনকেন্দ্র—সবই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিশানায় পরিণত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনিকে হত্যা করে ইসরায়েল ‘সর্বোচ্চ সীমা’ অতিক্রম করে। একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেছে তারা। গত জুনে যুদ্ধের শুরুর দিকে তারা এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। এমনটাই জানিয়েছেন ইসরায়েলের দুই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।
রোববার দুপুরের মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানান, ইরানের আকাশে তাঁরা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের যুদ্ধবিমান এখন তেহরানের আকাশে নির্বিঘ্নে উড়ছে।
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সাবেক কমান্ডার আমির এশেল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইরান পুরোপুরি বিমান হামলার জন্য উন্মুক্ত। কোথায়, কখন, কীভাবে আঘাত করা হবে, এটা এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা প্রায় কোনো চ্যালেঞ্জই ছুড়তে পারছে না। কার্যত পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।’
কর্মকর্তারা বলেন, এই স্বাধীনতা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের এতটাই আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল যে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব দ্রুত এই আকাশ অভিযান শেষ করতে চাইছে। বিশেষ করে রোববার জেরুজালেমের পশ্চিমে একটি আবাসিক এলাকায় ইরানের প্রাণঘাতী হামলার পর এ উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পায়। অথচ ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর এখনো অনেক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা বাকি।
‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ ও আকস্মিক বিষয়
শনিবারের হামলা বহু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আকস্মিক বিষয়।
গত জুনের ১২ দিনের সংঘাতের শুরুতেই খামেনিকে হত্যা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি আড়ালে চলে যান এবং আর সুযোগ তৈরি হয়নি।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেন, এ কারণেই শনিবারের হামলার পরিকল্পনাকারীরা হিসাব করেছিলেন, যদি কোনো শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যা করতে হয়, তবে তা প্রথম ধাক্কাতেই করতে হবে। নইলে দ্রুত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আরেক ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, শনিবারের হামলার আগে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা চলছিল। সামরিক গোয়েন্দারা এমন একটি সুযোগ খুঁজছিলেন, যখন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা একসঙ্গে এক স্থানে থাকবেন।
এবার রাতে নয়; বরং সকালে হামলা চালানো হয়, যা আগের অভিযানগুলোর থেকে ভিন্ন। এটিও কৌশলগতভাবে আকস্মিকতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
শনিবার সকালে প্রথম দফার হামলার পরপরই দ্বিতীয় দফা হামলা শুরু হয়। এতে তেহরানের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি নিশানা করা হয়।
ইসরায়েলের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আগের সংঘর্ষে ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। কিন্তু দেখা যায়, গত জুনের পর ইরান নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে আংশিকভাবে আবার কিছু বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে।
শনিবার ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র ছিল দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান থেকে দূর থেকে নিক্ষেপ করা যায়।
এটি মূলত ইসরায়েলের অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘অ্যারো’র জন্য অনুশীলন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন সংস্করণ ‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
২০২৪ সালে ইরানের এক হামলার জবাবে ইসরায়েল প্রথম এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটি রাডার সিস্টেমে আঘাত হানে। পরে একই বছরের নভেম্বরে এবং গত জুনেও ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি নিষ্ক্রিয় করতে এগুলো ব্যবহার করা হয়।
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারে হামাস নেতাদের একটি বৈঠকে হামলা চালাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। উদ্দেশ্য ছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলাকালে শীর্ষ হামাস নেতাদের হত্যা করা।
কিন্তু ওই হামলায় কোনো শীর্ষ হামাস নেতা নিহত হননি; বরং কাতারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হন। এতে ট্রাম্পের চাপের মুখে ইসরায়েলকে ক্ষমা চাইতে হয়।
‘কৌশলগত অতর্কিত হামলা’
এই সপ্তাহান্তে তৃতীয় দফার বিমান হামলার অভিযানে ইসরায়েল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিমানবহর মোতায়েন করে—প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েল এত বড় আকারে আর কখনো যুদ্ধবিমান পাঠায়নি। তখন ইসরায়েল মাত্র ১২টি বিমান বাদে বাকিগুলো মিসরের বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে হামলায় পাঠিয়েছিল।
এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষায়, কার্যত ‘পুরো বিমানবাহিনী’ পশ্চিম ও মধ্য ইরানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, যত দ্রুত সম্ভব যত বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা।
ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা চালানোর প্রায় আধা ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রও এ অভিযানে যুক্ত হয়। তারা পূর্ব ইরানে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, যা ইসরায়েল থেকে দূরে হলেও মার্কিন ঘাঁটির কাছাকাছি। ইসরায়েল নেয় পশ্চিম অংশের দায়িত্ব।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবহরেও হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি মাত্র জানতে পেরেছি, আমরা ইরানের ৯টি নৌযান ধ্বংস করেছি ও ডুবিয়ে দিয়েছি, যার কিছু ছিল বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাকিগুলোর পেছনেও যাচ্ছি, শিগগিরই সেগুলোও সাগরের নিচে ডুববে।’
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রোববার ইসরায়েল তেহরানে সরকারি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদর দপ্তর, গোয়েন্দা সদর দপ্তর, আইআরজিসি বিমানবাহিনীর কমান্ড সেন্টার, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তরসহ ইরানের ‘শাসনব্যবস্থার ডজন ডজন সামরিক কমান্ড সেন্টার’ আঘাত হেনেছে।