বিশ্বে প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজনের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই

রাস্তার ধারে তাজা শাকসবজি ও ফলমূল সাজিয়ে রাখছেন এক বিক্রেতা। পিটারমারিৎজবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা। ২১ মে ২০১৭ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের প্রতি তিনজনের একজন স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার এক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যের দাম মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে আনতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তি ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার কেনার সামর্থ্য নেই বিশ্বের ২৬৯ কোটি মানুষের। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করার যে বৈশ্বিক লক্ষ্য রয়েছে, তা অর্জনে ‘প্রচুর’ কাজ করতে হবে।

২০২৫ সালে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির যে প্রবণতা ছিল, তা-ও থামার ইঙ্গিত মিলেছে।

প্রতিবেদনের অন্যতম প্রণেতা ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো টোরেরো বলছেন, স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম মানুষের হার এখনো ‘অত্যন্ত বেশি’।

‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর খাবারের খরচের একটি হিসাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম ৪ দশমিক ২৮ পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা ডলার। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ২৮ ডলারে যে পরিমাণ জিনিস কেনা যায়, যেকোনো দেশে সেই পরিমাণ অর্থের সমমূল্যই হলো একটি স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম।

ম্যাক্সিমো টোরেরো বলেন, ‘চরম দারিদ্র্যসীমা হলো জনপ্রতি দৈনিক ৩ পিপিপি ডলার। ফলে স্বাস্থ্যকর খাবারের এই খরচ দারিদ্র্যসীমার চেয়ে অনেক বেশি।’ তিনি আরও বলেন, সরকারগুলো সাধারণত মাংস, দুগ্ধজাত খাবার, ফল ও শাকসবজির চেয়ে দানাশস্য এবং শ্বেতসারজাতীয় মূল খাবারগুলোতে বেশি ভর্তুকি দেয়।

এর অর্থ হলো, মানুষ কেবল ক্যালরি পাচ্ছে, কিন্তু খাবারে কোনো বৈচিত্র্য থাকছে না। স্থূলতার পাশাপাশি ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো রোগের বিস্তারে এর প্রভাব রয়েছে বলে টোরেরো উল্লেখ করেন।

এই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত জাতিসংঘের আরেক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরিসংখ্যানেও এমন চিত্র দেখা যায়। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১২ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ম্যাক্সিমো টোরেরো বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতা খুব দ্রুত বাড়ছে। স্থূলতা বৃদ্ধির কারণে যে ঝুঁকি ও অদৃশ্য খরচ বাড়বে, তা কমানোর জন্য আমাদের এখন নিবিড়ভাবে কাজ করা প্রয়োজন।’

টোরেরো অবকাঠামো, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। প্রতিবেদনে একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা গেলে মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং ফল ও শাকসবজির দাম কমিয়ে আনা সম্ভব।

ম্যাক্সিমো টোরেরোর মতে, ফল ও শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করা হলে তা বেশ কাজে দিতে পারে। এতে পুষ্টিহীনতার কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির অর্থনৈতিক প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, আফ্রিকার ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখে না। এ হার এশিয়া অথবা লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।

প্রথমবারের মতো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের আবাসস্থল এখন আফ্রিকা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, মহাদেশটিতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ। আর এশিয়ায় এই সংখ্যা ২৯ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্য দিয়ে এশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে আফ্রিকা।

ম্যাক্সিমো টোরেরো বলেন, আফ্রিকায় উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই মূলত ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এতটা বেড়েছে। তবে ‘বহু বছরের মধ্যে এবারই প্রথম’ আনুপাতিক হারে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যানে আমরা এমন একটি সময়ে ক্ষুধার্ত মানুষের হার কমতে দেখেছি, যখন এ অঞ্চলে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যে বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব আগামী বছরের পরিসংখ্যানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফাও, ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।