ঢাকায় হাত মেলানো: ২০২৬ সালে কি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বরফ গলবে

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক (ডানে) গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় খালেদা জিয়ার জানাজার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেনছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বছরের শেষ দিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর এমন একটি কাজ করলেন, যা দেশটির পুরুষ, নারী ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল সম্প্রতি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তিনি নয়াদিল্লির চিরবৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে প্রকাশ্যে হাত মিলিয়েছেন।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গত সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নেতারা ঢাকায় সমবেত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের সংসদ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার আয়াজ সাদিক।

ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের একটি অপেক্ষমাণ কক্ষে সাদিক অবস্থান করছিলেন। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের কূটনীতিকের উপস্থিতিতে জয়শঙ্কর এগিয়ে গিয়ে সাদিকের সঙ্গে হাত মেলান।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) প্রবীণ রাজনীতিক আয়াজ সাদিক গত বুধবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘তিনি (জয়শঙ্কর) আমার দিকে এগিয়ে এসে অভিবাদন জানান। তখন আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি হাসিমুখে নিজের পরিচয় দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তিনি বললেন, ‘‘মান্যবর, আমি আপনাকে চিনি, পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’’’

সাদিক জানান, জয়শঙ্কর কক্ষে প্রবেশের পর প্রথমে নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এরপর তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন।

ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের একটি অপেক্ষমাণ কক্ষে সাদিক অবস্থান করছিলেন। সেখানে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর বেশ কয়েকজন কূটনীতিকের উপস্থিতিতে জয়শঙ্কর এগিয়ে গিয়ে সাদিকের সঙ্গে হাত মেলান।

পাকিস্তানি এই রাজনীতিক আরও বলেন, ‘তিনি (জয়শঙ্কর) কী করছেন, সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। কক্ষে অন্য ব্যক্তিদের উপস্থিতির বিষয়েও তিনি সজাগ ছিলেন। তাঁর মুখে হাসি ছিল এবং তিনি বেশ সচেতন ছিলেন।’

আয়াজ সাদিকের দপ্তর থেকে এ শুভেচ্ছা বিনিময়ের কিছু ছবি শেয়ার করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এক্স হ্যান্ডল থেকেও ছবিটি পোস্ট করা হয়।

এ দৃশ্য ছিল গত সেপ্টেম্বরের ঠিক উল্টো। গত বছর এশিয়া কাপের লড়াইয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ও তাঁর সতীর্থরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টের শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে ভারত শিরোপা জিতলেও তা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের তিক্ততাকেই স্পষ্ট করে তুলেছিল।

তিনি (জয়শঙ্কর) আমার দিকে এগিয়ে এসে অভিবাদন জানান। তখন আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি হাসিমুখে নিজের পরিচয় দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম, তিনি বললেন, ‘মান্যবর, আমি আপনাকে চিনি, পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
—আয়াজ সাদিক, পাকিস্তানের স্পিকার ও ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এনের প্রবীণ রাজনীতিক

গত মে মাসে এ দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে চার দিনের এক ভয়াবহ সংঘাত সংঘটিত হয়। সেখানে উভয় দেশ জয়ী হওয়ার দাবি করেছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর এটিই ছিল দেশ দুটির বৈরিতার সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা।

দুই দেশের এই লড়াইয়ের প্রভাব যখন খেলার মাঠেও ছড়িয়ে পড়ে, তখন এটিই প্রতীয়মান হচ্ছিল যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তাদের প্রতিটি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় মিশে গেছে। গত বুধবার জয়শঙ্করের করমর্দনের আগপর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল।

ভারতের কিছু বিশ্লেষক এ ঘটনাকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটিকে বরফশীতল সম্পর্কে সম্ভাব্য উষ্ণতার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের কিছু বিশ্লেষক এ ঘটনাকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটিকে বরফশীতল সম্পর্কে সম্ভাব্য উষ্ণতার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মোস্তফা হায়দার সাইদ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি মনে করি, জয়শঙ্কর ও আয়াজ সাদিকের মধ্যকার এ আলাপচারিতা নতুন বছরের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।’

মোস্তফা হায়দার আরও বলেন, ‘সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যূনতম স্বাভাবিকতা বজায় রাখা; যেখানে কর্মকর্তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় ও হাত মেলানো হয়—তা খুবই জরুরি। দুর্ভাগ্যবশত ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধের পর এ ন্যূনতম সৌজন্যটুকুও অনুপস্থিত ছিল।’

বৈরিতার আরও অবনতি

দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক কয়েক বছর ধরেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানের স্পিকারকে অভিবাদন জানাচ্ছেন, এমনটা কল্পনা করা যায় না।
—সরদার মাসুদ খান, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত

ভারত এ হত্যাকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং এর জেরে অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি ছয় দশকের পুরোনো ‘সিন্ধু নদ পানি বণ্টন চুক্তি’ (আইডব্লিউটি) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। সিন্ধু অববাহিকার অভিন্ন ছয় নদীর পানি ব্যবহারের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি কার্যকর ছিল।

পাকিস্তান ওই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তবে মে মাসের শুরুর দিকে দুই দেশ চার দিনের এক তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়; যা গত তিন দশকের মধ্যে ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত।

যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে এ সংঘাতের অবসান ঘটে। এ জন্য পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামাবাদ ও ঢাকার সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে। ইসলামাবাদ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরালো করেছে।

তবে ভারত দাবি করে, দুই দেশের (ভারত-পাকিস্তান) কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগমাধ্যমে এ যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার দীর্ঘদিনের বিরোধিতার অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি এ অবস্থান বজায় রেখেছ।

এরপরও দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে এবং আবার সংঘাতের আশঙ্কাও শেষ হয়ে যায়নি। উভয় দেশের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। পাশাপাশি দেশ দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ঢাকায় দুই দেশের নেতার হাত মেলানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত সরদার মাসুদ খান এ হাত মেলানোকে একটি চমৎকার কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানের স্পিকারকে অভিবাদন জানাচ্ছেন—এমনটা কল্পনা করা যায় না।’

জাতিসংঘ ও চীনেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খান উল্লেখ করেন, মে মাসে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষকে একটি নিরপেক্ষ দেশে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিল।

ভারত সে সময় সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। নয়াদিল্লির কথা ছিল, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে হামলা চালানো বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো আলোচনার মানে হয় না। ভারত কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদে’ মদদ দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানও একই ধরনের পাল্টা অভিযোগ করে দাবি করছে যে নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

উভয় পক্ষ একে অপরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে পাকিস্তান কখনো কখনো স্বীকার করেছে যে ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার মতো ভারতের মাটিতে বড় কিছু হামলার পরিকল্পনাকারীরা পাকিস্তানের ভেতরেই ছিলেন।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যদি কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়ও, তবে সে জন্য বাংলাদেশ খুব একটা স্বাভাবিক জায়গা নয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার আগে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং তাঁদের হাজার হাজার সৈন্যকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল ভারত।

তাঁরা দুজন কাকতালীয়ভাবে একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা যা করেন, তাঁরাও তা-ই করেছেন। তাঁরা হাত মিলিয়েছেন ও কুশল বিনিময় করেছেন।
—রেজাউল হাসান লস্কর, হিন্দুস্তান টাইমসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

মাসুদ খান বলেন, ‘যে কারণেই এটি (হাত মেলানো) হোক না কেন, তা এ অঞ্চলের জন্য ভালো। তবে সামনের পথ অনেকগুলো “যদি” ও “কিন্তু”তে ঘেরা।’

হিন্দুস্তান টাইমসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্কর এ হাত মেলানোর গুরুত্বকে খুব একটা বড় করে দেখছেন না। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘তাঁরা দুজন কাকতালীয়ভাবে একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা যা করেন, তাঁরাও তা-ই করেছেন। তাঁরা হাত মিলিয়েছেন ও কুশল বিনিময় করেছেন।’

রেজাউল হাসান আরও উল্লেখ করেন, এ সাক্ষাতের সব ছবি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে, ভারতের পক্ষ থেকে নয়। এটি বেশ ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।

রেজাউল হাসান মনে করিয়ে দেন যে ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক টেকসই সংলাপ হয়নি। দুই দেশের আস্থায় যে বিশাল ঘাটতি, তাতে কোনোভাবেই তাদের আবার কাছাকাছি আসাটা দেখা কঠিন।

আরও পড়ুন

পানি-রাজনীতি

মের সংঘাতের ফলে সম্ভবত সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি (আইডব্লিউটি) স্থগিত করা বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তে।

পাকিস্তান বলছে, এ পদক্ষেপ তার জনগণের জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের হুমকি তৈরি করেছে। কারণ, পাকিস্তান সিন্ধু, চেনাব ও ঝিলাম—এই তিন নদীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর সব কটিই ভারত বা ভারতশাসিত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খান বলেন, ভারত যদি নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে এবং এই পানিবণ্টন চুক্তিতে ফিরে আসে; তবে তা হবে একটি বড় ধরনের আস্থা তৈরির পদক্ষেপ ও সম্পর্কোন্নয়নের এক ইঙ্গিতবাহী অগ্রগতি।

তবে এ বিষয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না রেজাউল হাসান লস্কর। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা যাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে এ চুক্তি স্থগিত হওয়ার বিষয়টি কোনো অবাক হওয়ার মতো ঘটনা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন ও স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দুই দেশের মধ্যে কার্যত কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ নেই।’

আরও পড়ুন

অনিশ্চিত সম্পর্ক

গত এক বছরে পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের উন্নতি লক্ষ করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম দেশটি একটি প্রধান আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামাবাদ ও ঢাকার সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে।

ইসলামাবাদ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরালো করেছে। প্রকৃতপক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার জনসমক্ষে পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। এমনকি সম্প্রতি তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ফিলিস্তিনের গাজায় নিরাপত্তাব্যবস্থা তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্র-প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে পাকিস্তান যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে দেশটি।

অন্যদিকে ভারত ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, যেখানে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১৯ শতাংশ।

পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সাল কি নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে উত্তেজনার প্রশমন ঘটাতে পারবে? উঠেছে এমন প্রশ্ন।

ইসলামাবাদভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মোস্তফা হায়দার সাইদ বলেন, অন্তত ন্যূনতম যোগাযোগ বজায় রাখা উভয় দেশের ‘জাতীয় স্বার্থে’ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ‘উভয় দেশ একটি মৌলিক ও ন্যূনতম এজেন্ডা ঠিক করতে পারে; যেখানে সম্পর্কের নিয়মকানুন, রেডলাইন বা সীমারেখা এবং সুরক্ষাকবচ নির্ধারণ করা থাকবে। এটি সম্পন্ন হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি মৌলিক পর্যায়ের সংলাপ শুরু করা যেতে পারে।’

তবে মে মাসের সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে মাসুদ খান এ বিষয়ে সন্দিহান।

আরও পড়ুন

রেজাউল হাসান লস্কর বলেন, ২০১৯ সাল থেকে ভারত তার ওপর হওয়া হামলার প্রতিক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে কঠোর থেকে কঠোরতর করেছে। ফলে তিনি মনে করেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্দার আড়ালের যোগাযোগ বা ‘ব্যাক-চ্যানেল’ আবার চালু করা জরুরি। কারণ, অতীতে এ প্রক্রিয়া কার্যকর হয়েছিল।

লস্কর বলেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ক্ষমতার সুসংহতকরণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা এবং পাকিস্তান-সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি—বিষয়গুলো এ অঞ্চলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। নয়াদিল্লি তার পরবর্তী পদক্ষেপে নিশ্চিতভাবেই এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখবে।

সাইদও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, কোনো সহিংসতার ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে একে অপরকে দোষারোপ না করে একটি ‘পূর্বনির্ধারিত ও পারস্পরিক সম্মতির প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা একটি বড় অগ্রগতি হতে পারে।

এই পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, ভারতও বুঝতে পেরেছে যে তারা পাকিস্তানের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বা দেশটিকে উপেক্ষা করে পার পাবে না।’ তাঁর মতে, পাকিস্তান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং ভারত এখন অন্তত ন্যূনতম পর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

আরও পড়ুন