বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

২.

একটু ইতিহাসে ফিরে যাওয়া যাক। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে ছিনতাই করা উড়োজাহাজ দিয়ে হামলা চালানো নিছক সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। ১১০ তলার গগনচুম্বী ভবন দুটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শৌর্য ও মর্যাদার প্রতীক। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে দুটি ভবনই বিশাল ধুলার ঝড় তুলে মাটিতে গুঁড়িয়ে পড়েছিল। আর তাতে নিহত হয়েছিল তিন হাজারের বেশি নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। ছিলেন বাংলাদেশিরাও।

জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র তখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায়। এ হামলার জন্য দায়ী করা হলো সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেনের আল–কায়েদা গোষ্ঠীকে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আচমকা হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। আগেই বলা হয়েছে, এই আল–কায়েদার আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা আফগানিস্তানের তালেবান গোষ্ঠী, যারা তখন ওই দেশটির ক্ষমতায়। প্রেসিডেন্ট বুশ দিলেন তাঁর নয়া তত্ত্ব—ওয়ার অন টেরর বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। লক্ষ্য আল–কায়েদা ও তালেবান গোষ্ঠীকে উৎখাত, যে তালেবান গোষ্ঠীকে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়ই তৈরি করা হয়েছিল।

default-image

মোল্লা ওমরের তালেবান ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করল। আর এর মধ্য দিয়েই অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল যুদ্ধ।

আফগানিস্তানের বড় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনাচার দুটি দেশের মানুষের। দুই দেশের মানুষের জন্য সীমান্ত প্রায় সময় উন্মুক্ত থাকে। মানুষজন এপার-ওপার হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের ভাষায়, দুটি দেশ আপন ভাইয়ের মতো।

আমরা এ লেখায় ৯/১১–পরবর্তী পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।

প্রেসিডেন্ট বুশ জানতেন, আফগানিস্তানে তালেবান ও আল–কায়েদা উৎখাতে তিনি ন্যাটোসহ অধিকাংশ বড় শক্তির সহায়তা পাবেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে পাকিস্তানের সহায়তা।

গত শতকের আশির দশকে আফগানিস্তানে রুশপন্থী সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তৈরি করেছিল হাজারো মুজাহিদিন, যাদের বড় অংশটি পরিচালিত হতো পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের বুদ্ধি-পরামর্শে। এই মুজাহিদিনদের একটি অংশই পরবর্তী সময়ে তালেবান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ওই সময় তালেবান ও আল–কায়েদা দমনে পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে হাত মেলানো ছাড়া প্রেসিডেন্ট বুশের সামনে কোনো পথ খোলা ছিল না।

default-image

তবে পাকিস্তানের জন্য ওয়ার অন টেরর নামের এই ব্যান্ডওয়াগনে যোগ দেওয়া ছিল খুবই কঠিন কাজ। যদিও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে তখন শক্তিশালী সেনা কর্মকর্তা পারভেজ মোশাররফ। এমনিতেই দেশটি তখন হাজার রকম নিরাপত্তা সমস্যায় জর্জরিত। যুক্তরাষ্ট্রের এ আহ্বানে যোগ দেওয়ার অর্থ ছিল নিজ দেশের খেপে থাকা ধর্মীয় কট্টরপন্থী অংশটিকে তাতিয়ে দেওয়া, বিপদের মধ্যে আরও বিপদকে আমন্ত্রণ জানানো। ধর্মীয় গোষ্ঠীরা কখনোই চায়নি পাকিস্তান তার প্রতিবেশী ‘মুসলিম ভাইয়ের’ বিরুদ্ধে রক্তারক্তিতে নামুক। পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক আহমেদ রশিদ তাঁর ‘ডিসেন্ট ইনটু ক্যাওস: দ্য ইউএস অ্যান্ড দ্য ডিজাস্টার ইন পাকিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া’ (২০০৯ সালে পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত) বইয়ে ৯/১১–পরবর্তী পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে টরচারাস বা ‘নিপীড়নমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তা ছাড়া তখন তালেবান সরকারকে স্বীকৃতিও দিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের নাগরিক গোষ্ঠীর মধ্যে একটি ধারণা তখন ভিত্তি পাচ্ছিল যে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সব সময় নির্ধারিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের দিক থেকে, পাকিস্তানের স্বার্থের দিক থেকে নয়। তাই বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’–এ ঢোল-বাদ্য নিয়ে পাকিস্তানের নেমে পড়ার কোনো কারণ নেই।

default-image

প্রথম দিকে অনিচ্ছা দেখালেও পারভেজ মোশাররফ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। তখন মোশাররফ বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিয়েছে যোগ না দিলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া হবে (টাইমলাইন: যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের ইতিহাস। ডন, ৪ জুলাই ২০১২)

পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে তার বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এই সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দেয় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ। পরবর্তী সময়ে (২০০৯) দুই দেশের মধ্যে কেরি লুগার বিল পাস হয়, যার আওতায় পরবর্তী পাঁচ বছরে পাকিস্তানকে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা ছিল (যা পরে যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে অ্যাবোটাবাদে বিন লাদেনকে হত্যার পর)।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে অবতীর্ণ হওয়ায় আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতির জন্য তালেবান সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করে। তালেবান এ সময় পাকিস্তানে একাধিকবার হামলাও চালায়।
তবে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীর খাতায় নাম লেখালেও কখনো ওয়াশিংটনের পুরোপুরি আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বরং বিভিন্ন সময় শুনতে হয়েছে তলেতলে তালেবানের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রাখার খোঁটা। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরি তাঁর ‘নিদার আ হক নর আ ডাভ: অ্যান ইনসাইডারস অ্যাকাউন্ট অব পাকিস্তান ফরেন পলিসি’ (২০১৫ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত) বইয়েও সে কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। কাসুরি লিখেছেন, পাকিস্তানের ওই সময়ের নীতি ছিল নিজ স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান উভয়কেই হাতে রাখা এবং দেশ দুটির স্বার্থকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা। কৌশলগত কারণে পাকিস্তান কখনো চায়নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে পরিত্যাগ করতে। কারণ, কাশ্মীর ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সমর্থন ইসলামাবাদের সব সময় প্রয়োজন ছিল।

default-image

আফগানিস্তানে তালেবান উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র নজর দেয় সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের দিকে। সে অভিযানেও পাকিস্তানকে পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন পাকিস্তানের অবস্থান ছিল ইরাকের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পক্ষে। তখনো দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের সম্পর্ক চলতে থাকে। ২০০৮ সালে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দফা বিমান হামলায় ১১ ও ২৪ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। দ্বিতীয় ঘটনাটির পর পাকিস্তান তার সালালা বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে খালি করে দিতে বলে, যে ঘাঁটি ব্যবহার করে আফগানিস্তানে তালেবানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হতো।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট হন বারাক ওবামা। আগের বছর পাকিস্তানেও সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জিতে প্রেসিডেন্ট হন আসিফ আলী জারদারি। ওবামা ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন, জর্জ বুশ যা অগ্রাহ্য করেছিলেন। এর মধ্যে ২০১১ সালের ১ মে ঘটে যায় বড় ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিলের সদস্যদের হাতে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ধৃত ও নিহত হন ওসামা বি লাদেন।

কিন্তু ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ায় পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আবার ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ ঘটনায় পাকিস্তান তার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করে, যে লাদেনকে তারা খুঁজে আসছিল এক দশক ধরে।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় সম্ভাব্য জঙ্গিগোষ্ঠীর ওপর ড্রোন ও বিমান হামলা অব্যাহত রাখে। যদিও তা বিশেষ ফল দেয়নি। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর পরিণতি সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা জেনে গেছি।

৩.

পাকিস্তানের সঙ্গে কিছু কিছু পশ্চিমা দেশের সম্পর্ক তেমন ভালো নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই বৈরী। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট এইচ আর ম্যাকমাস্টার বলেছেন, জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখলে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি এমন হলেও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি ঠিকই আফগানিস্তান বিষয়ে পাকিস্তানের দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদ সফর করেছেন। ইতালিও শিগগির যাবে। কূটনীতিকেরা মনে করেন, এখনো তালেবানের ওপর পাকিস্তানের বেশ কিছুটা প্রভাব আছে।

পাকিস্তান প্রায় ৩০ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। দেশটি জানে, আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা না এলে শরণার্থীদের এ ঢল অব্যাহত থাকবে, যা তার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও ভঙ্গুর করবে। তাই তালেবানের নতুন সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করুক, আল–কায়েদা এবং স্থানীয় ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে দমন করুক, পাকিস্তান তা প্রত্যাশা করে।

তবে সামনের দিনগুলোয় আফগানিস্তানে কী ঘটতে যাচ্ছে, ৯/১১ হামলার দুই দশক পরের এই প্রেক্ষাপটে, তা আঁচ করা কঠিন বৈকি। তবে এটুকু পরিষ্কার, তালেবান, আল–কায়েদা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের যে বোঝা পাকিস্তান নামের দেশটির স্কন্ধে চেপেছে, তা সহজে নামছে না। এ বোঝা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মহাসড়কে পথ চলতে হবে দেশটিকে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, আইওএসআর জার্নাল অফ হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশাল সায়েন্স ও ফরেন পলিসি।

কাজী আলিম-উজ-জামান: সহকারী বার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন