বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী দেশটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কমই পড়ে।

পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার প্রভাব দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর ওপর কেমন পড়তে পারে? অনেকেই মনে করছেন, এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে ইমরান খানকে বিদায় নিতে হতে পারে।

আফগানিস্তান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরেছে। অর্থের অভাব ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। কাতারই এখন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি অংশীদার।
চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির ইন্দো-প্যাসিফিক সিকিউরিটি প্রোগ্রামের পরিচালক লিসা কার্টিস বলেন, ‘তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানকে আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। কাতার এখন সেই ভূমিকায়।’

তালেবান ও পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তের কাছে হামলায় কয়েক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। পাকিস্তান চায়, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আরও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক তালেবান। তাদের আশঙ্কা, এসব গোষ্ঠী পাকিস্তানে সহিংসতা ছড়াতে পারে। সেটি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মানবাধিকার বিষয়ে অধিকাংশ বিদেশি নেতার চেয়ে ইমরান খানকে তালেবানের কম সমালোচনা করতে দেখা যায়।

চীন

পাকিস্তান ও বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর অব্যাহতভাবে জোর দিতেন ইমরান খান। ৬০ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রতিবেশীদের একই বন্ধনে আবদ্ধের জন্যই করা। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ও উদ্বোধন হয়েছে পাকিস্তানের দুটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় থাকার সময়। এখন উভয় দলই ইমরানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়।
পূর্বাঞ্চলীয় পাঞ্জাব প্রদেশের নেতা হিসেবে চীনের সঙ্গে সরাসরি এ চুক্তি সই করেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ। বড় অবকাঠামো পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সুনাম অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক লোকদেখানোর বিষয়টি এড়িয়ে তাঁর এমন অবস্থান বেইজিংয়ের জন্যও সুখকরই মনে হবে।

ভারত

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান তিনবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড কাশ্মীর নিয়ে। আফগানিস্তানের পাশাপাশি এই স্পর্শকাতর এলাকার নীতিও নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী। ২০২১ সালের পর থেকে দুই দেশের মেনে চলা (ডি ফ্যাক্টো) সীমান্তে উত্তেজনা সবচেয়ে কম পর্যায়ে রয়েছে।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সংলাপ হয়নি। ইমরান খান ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা সামলানো নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কড়া সমালোচনা করে আসছেন। এ ছাড়া আরও বহু ইস্যুতে অবিশ্বাসের কারণে এ ধরনের সংলাপ আলোর মুখ দেখছে না।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর নজর রাখেন ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক করন থাপার। তিনি বলেন, কাশ্মীরে সফল অস্ত্রবিরতি বাস্তবায়নে নতুন বেসামরিক সরকারের ওপর চাপ দিতে পারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
গত শনিবার পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া বলেছেন, যদি ভারত রাজি হয়, তাহলে কাশ্মীর ইস্যুতে সামনে এগোতে প্রস্তুত আছে তাঁর দেশ। তবে বছরের পর বছর ভারতকে সমঝোতামূলক প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় রয়েছে শরিফ রাজনৈতিক পরিবার।

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাপক বিক্ষোভ কিংবা ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি না হলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে অগ্রাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি এখন ইউক্রেন যুদ্ধ সামলাতে ব্যস্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট রবিন র‍্যাফেল বলেন, ‘মনোযোগ দেওয়ার আরও বহু ইস্যু আছে আমাদের।’

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, যেহেতু নেপথ্যে থেকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাই ইমরান খানের রাজনৈতিক ভাগ্যে কী ঘটছে, সেটা বড় উদ্বেগের বিষয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ছিলেন কার্টিস। তিনি বলেন, ‘যদি সামরিক বাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় যে নীতি-কৌশল কেমন হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে নেবে, যেমন আফগানিস্তান, ভারত ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে নেয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন বহুলাংশে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অপ্রাসঙ্গিক।’

কার্টিস বলেন, ইমরান খানের মস্কো সফর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বিপর্যয়কর’। ইসলামাবাদের নতুন সরকার ‘কিছুটা হলেও’ এ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারবে।

ইমরান খান পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক মস্কো সফরের কারণে ওয়াশিংটন তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়।

অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে জাতীয় পরিষদে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব রোববার ডেপুটি স্পিকার নাকচ করে দিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট। ৯০ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন দেশটিতে নতুন নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে পুরো প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গেছে বিরোধী দলগুলো।

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন