ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামাতে কীভাবে কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত বুধবার সন্ধ্যায় উড়োজাহাজ থেকে নামার পর তাঁকে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান আলোচক আব্বাস আরাগচি। সামরিক পোশাকে পাকিস্তানের ক্ষমতাধর এই সেনাপ্রধানকে দেখে শান্তির দূত মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ঠিক এই ভূমিকাই তিনি পালন করতে চেয়েছিলেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার শেষ চেষ্টা হিসেবে আসিম মুনির বুধবার তেহরানে ছুটে যান। এর চার দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। আবার যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফার আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা বললেও ইরানের বন্দরে অবরোধ জারি রাখায় বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রথম দফার আলোচনা চুক্তি ছাড়া শেষ হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ আরোপ করেন। এতে উত্তেজনা নতুন করে বেড়ে যায়। তবে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আসিম মুনিরের ‘চমৎকার’ প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন ট্রাম্প। বুধবার রাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ওয়াশিংটনের একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে তেহরানে পৌঁছান। এ প্রস্তাবে আগামী সপ্তাহে ইসলামাবাদে নতুন করে আলোচনার একটি রূপরেখার (ফ্রেমওয়ার্ক) কথা বলা হয়েছে।
ফিল্ড মার্শাল মুনিরই এখানে মূল চালিকা শক্তি। তিনি না থাকলে এই প্রক্রিয়া সফল হতো না।মালিহা লোদি, পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই অভাবনীয় কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। আসিম মুনিরকে এ প্রচেষ্টার মূল কারিগর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি সেই হাতে গোনা ব্যক্তিদের একজন, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলতে পারেন। একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দুই পক্ষের বার্তা আদান-প্রদান করছেন। এখন এ বিষয় সবার জানা, এই আলোচনার কলকাঠি ইসলামাবাদে অবস্থিত পাকিস্তানের সংসদ ভবন থেকে নয়, বরং রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত দেশটির সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে নাড়ানো হচ্ছে।
জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোদি বলেন, ‘ফিল্ড মার্শাল মুনিরই এখানে মূল চালিকা শক্তি। তিনি না থাকলে এ প্রক্রিয়া সফল হতো না।’
মালিহা লোদি আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল একটি সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো আসিম মুনিরের ওপরই আস্থা রাখছে। আমাদের সরকারের মন্ত্রীরা এখানে কেবল নামমাত্র যুক্ত আছেন।’
আসিম মুনিরের কিছু ফোন কল গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। তখন ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, চুক্তি না হলে ইরানের সভ্যতা ‘ধ্বংস’ হয়ে যাবে। সেই চরম মুহূর্তে আসিমের তৎপরতার কারণেই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির সমঝোতা সম্ভব হয়েছিল।
শোনা যায়, ট্রাম্প সরাসরি আসিমের ওপর ভরসা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, আসিম যেন ইরানিদের সঙ্গে তাঁর জানাশোনা ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের পথ থেকে ফেরার একটি সুযোগ তৈরি করেন। ১৩ এপ্রিল ইসলামাবাদে যখন দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি বৈঠকে বসেন, তখন তৃতীয় পক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আসিম সেই একই ঘরে উপস্থিত ছিলেন।
চলতি সপ্তাহে আসিম গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহক ও আলোচক হিসেবে ইরান সফর করেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক সফরে যান। মধ্যস্থতার এ প্রচেষ্টায় আঞ্চলিক সমর্থন অর্জনই ছিল তাঁর সফরের লক্ষ্য।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে সেনাপ্রধানের পদটি অনির্বাচিত হলেও অত্যন্ত ক্ষমতাধর। নামমাত্র বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেনাপ্রধানই দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন। পাকিস্তানের জন্য এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও বরাবরই পাকিস্তানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে সামরিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক পুনর্গঠনে আসিমের বড় ভূমিকা ছিল। কৌশলগত সাফল্য, লবিং ও চাটুকারিতার সংমিশ্রণে তিনি ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক হিসেবে শুরুতে আসিম মুনির এতটা পরিচিত ছিলেন না। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর অভ্যন্তরীণ বিষয়েই তাঁর মূল নজর ছিল। এর মধ্যে বিরোধী দলকে দমন এবং নিজের ক্ষমতা একচেটিয়াভাবে কুক্ষিগত করার বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত ছিল।
তবে গত দেড় বছরে আসিম মুনির নিজেকে একজন বৈশ্বিক দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও তেহরানের সঙ্গে তিনি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তিনি দুবার হোয়াইট হাউস সফর করেন। এ সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান চুক্তি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষাচুক্তি স্বাক্ষরে তিনি প্রধান ভূমিকা রাখেন।
মালিহা লোদির মতে, ‘ঘন ঘন সফর ও যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে তিনি বেশ দক্ষ। তিনি অলস বসে থাকার লোক নন। কোনো ফোনের অপেক্ষায় না থেকে তিনি নিজেই ফোন তুলে নিয়ে সরাসরি কথা বলেন।’
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক পুনর্গঠনে আসিম মুনিরের বড় ভূমিকা ছিল। কৌশলগত সাফল্য, লবিং ও কথা দিয়ে খুশি করার সংমিশ্রণে তিনি ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করেছেন। বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ (হাইপ্রোফাইল) সন্ত্রাসীকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে তিনি শুরুতেই ট্রাম্পকে বড় একটি বিজয় উপহার দেন।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে উত্তেজনা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র তাতে মধ্যস্থতা করে। পাকিস্তান তখন ট্রাম্পকে প্রাণঢালা ধন্যবাদ জানায়। এমনকি তাঁর নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করে। ওই সংকটের সময় আসিম মুনির নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। এটা দেশে-বিদেশে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় করে।
ফিল্ড মার্শাল মুনিরের নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কেন্দ্রনির্ভর ব্যবস্থার কারণেই পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে।অবিনাশ পালিওয়াল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক, লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়
এর দুই মাস এবং ওয়াশিংটনে লবিস্টদের পেছনে ৫০ লাখ ডলারের (৬০ কোটি ৫০ লাখ টাকা) বেশি খরচ করার পর আসিম হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের দাওয়াত পান। তেল, খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং প্রশংসার মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফিল্ড মার্শাল আসিমকে এতটাই পছন্দ করেন যে কয়েক মাসের মধ্যে তাঁকে আবারও ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্প তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে ‘অসাধারণ মানুষ’, ‘দুর্ধর্ষ যোদ্ধা’ এবং ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আসিম বেশ অভিজ্ঞ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাল্টাপাল্টি সীমান্ত হামলার কারণে তেহরান-ইসলামাবাদ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত বছর সেই তিক্ততা দূর হয়। গাজা ও পরবর্তী সময়ে ১০ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলার কঠোর নিন্দা জানায় পাকিস্তান। সুন্নিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানে সাধারণ মানুষ প্রবলভাবে ইরানের পক্ষে।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, আসিম শুরুতে ‘প্রতিকূল পরিস্থিতিতে’ থাকলেও পরে তিনি তা দারুণভাবে সামলে নেন। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের মনস্তত্ত্ব এবং ব্যক্তিত্বনির্ভর কূটনীতির গুরুত্ব তিনি সঠিকভাবে ধরতে পেরেছেন।
গত দেড় বছরে আসিম মুনির নিজেকে একজন বৈশ্বিক দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও তেহরানের সঙ্গে তিনি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
পালিওয়াল বলেন, ‘ফিল্ড মার্শাল মুনিরের নেতৃত্বাধীন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণেই পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে।’
তবে পালিওয়ালসহ অনেক বিশেষজ্ঞ পাকিস্তানের এই ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার পুরো কৃতিত্ব কেবল একজন মানুষকে দিতে রাজি নন। তাঁদের মতে, যুদ্ধবিরতির চুক্তির পক্ষে সমর্থন আদায়ে দেশটির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরাও চীন, সৌদি আরব ও তুরস্কে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুহাম্মদ মেহদি বলেন, ‘আসিম মুনির সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঠিকই; তবে এটি একটি যৌথ প্রচেষ্টা। এখানে সরকার ও সামরিক বাহিনীর অনেক পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার সাফল্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। একদিকে এটি আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও যা অসম্ভব মনে হচ্ছিল, সেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাকিস্তান নিজেকে প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রমাণ করতে চায়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তবে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়াটা পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ, এ যুদ্ধ চলতে থাকলে পাকিস্তানের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা আরও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
পালিওয়াল মনে করেন, যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে কোনো চুক্তি সম্ভব হলেও সেখানে আসিম মুনিরের ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে না। এর ফলে পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষায় পাকিস্তান একটি প্রধান সক্রিয় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
পালিওয়ালের ভাষায়, ‘মুনির মনে করেন, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের যে নিরাপত্তাকাঠামোই তৈরি হোক না কেন, সেখানে তাঁর বড় ধরনের ভূমিকা থাকবে। শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখন কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আর মুনিরের জন্য এটি বিশ্বজুড়ে নিজের ও দেশের প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়ার এক বড় সুযোগ।’