যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বাস্তবায়নে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের কী লাভ হতে পারে

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক হোটেল কমপ্লেক্সে বৈঠক চলাকালে (বাঁ থেকে) মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল–থানি। ২১ জুন ২০২৬, লেক লুসার্নছবি: রয়টার্স

সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অবকাশযাপনকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল–থানির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

এই তিনজন থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়েছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। নিজের বক্তব্য শুরু করার সময় জেডি ভ্যান্স তাঁর দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।

ভ্যান্স বলেন, ‘গত এপ্রিলে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যখন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামাবাদে আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন থেকেই আমি রসিকতা করে আসছি, আমার জীবনে দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন—একজন ভারতীয় ও একজন পাকিস্তানি। ভারতীয় সেই ব্যক্তি হলেন আমার স্ত্রী আর পাকিস্তানের ব্যক্তি হলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।’

ভ্যান্সের এ কথায় পুরো কক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী উষা ভ্যান্স একজন ভারতীয় অভিবাসী দম্পতির মেয়ে। ভ্যান্স আরও যোগ করেন, গত তিন মাসে তিনি অন্য যে কারও চেয়ে জেনারেল মুনিরের সঙ্গে বেশি কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসার প্রতিধ্বনি করে ভ্যান্স বলেন, ‘তাঁর দূরদর্শিতা ও সামরিক নেতৃত্ব না থাকলে আমরা আজ এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।’

এই প্রশংসা কেবল ওয়াশিংটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত সোমবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালানোর পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে সহযোগিতার জন্য তিনি ইসলামাবাদকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

পাকিস্তানের করাচির একটি পাইকারি বাজারে ঠেলাগাড়ি টানছেন এক শ্রমিক
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এ সফর স্পষ্ট করে দিয়েছে, গত চার মাস কীভাবে তেহরানের হিসাব-নিকাশে ইসলামাবাদের অবস্থানকে নতুন করে বদলে দিয়েছে।

এই পুরো সময়ের বড় একটা অংশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান। তারা পেছনের দরজা দিয়ে যোগাযোগের পথ তৈরি করেছে, ইসলামাবাদে বৈঠকের আয়োজন করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে ইরানের সঙ্গে যাতায়াতের পথ খুলে দেওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকিও সামলেছে।

১৮ জুন শান্তিচুক্তির বিষয়ে যে সহমত হওয়া গেছে এবং বর্তমানে যে ৬০ দিনের আলোচনা চলছে, তা মূলত এই প্রচেষ্টারই ফসল।

তবে ইসলামাবাদের সামনে এখন মূল প্রশ্নটি খুবই স্পষ্ট—এসব কিছু থেকে পাকিস্তানের আসলে কী লাভ হচ্ছে?

অর্থনৈতিক চিত্র

পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এ প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত পাওয়া যায়, ততই মঙ্গল।

বিগত অর্থবছরে পাকিস্তান ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গতি। পাশাপাশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং রাজস্ব ঘাটতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

তবে লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখ (যিনি ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত) জানান, এসব সংখ্যার পেছনের আসল চিত্রটি অতটা আশাব্যঞ্জক নয়।

হিনা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানের এ মধ্যস্থতা হয়তো খুব সীমিত অর্থনৈতিক লাভ বয়ে আনবে। যেমন হরমুজ প্রণালি আবার খুলে গেলে জ্বালানি আমদানি খরচ কমতে পারে এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ঝুলে থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে নতুন গতি আসতে পারে।’

এই অর্থনীতিবিদ আরও যোগ করেন, সাম্প্রতিক এই প্রবৃদ্ধি আসলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে হয়নি; বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে তেল ও গ্যাস আমদানি সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার ফল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠক শেষে পাকিস্তান সফরে যান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এ সময় তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ২৩ জুন ২০২৬, ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের সময় এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তান এখনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৭০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচির অধীন রয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে এটি আইএমএফের সঙ্গে দেশটির ২৫তম ঋণচুক্তি, যা ২০২৪ সালে অনুমোদিত হয়েছিল।

পশ্চিমা দেশগুলো পাকিস্তানের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বললেও বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক ভালো সম্পর্ক থাকলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান চলে আসবে, তা নয়।

পাকিস্তানের জন্য এ পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ওয়াশিংটনের পাশে দাঁড়ানোর কারণে পাকিস্তান ঋণ পুনঃ তফসিল এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু তা দেশটির অর্থনীতির মূল দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারেনি, যা আজও বহাল রয়েছে। যেমন অত্যন্ত ছোট করকাঠামো, দুর্বল রপ্তানি খাত এবং দীর্ঘস্থায়ী চলতি হিসাবের ঘাটতি।

তবে হিনা শেখ মনে করেন, এই কূটনৈতিক সম্পর্কগুলোর গুরুত্ব আছে।

পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ হিনা বলেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট কোনো ভূরাজনীতির ফল নয়। আর কেবল কূটনৈতিক সুনাম দিয়ে এর সমাধানও সম্ভব নয়। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এই সুসম্পর্ক ইসলামাবাদকে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে, যা তারা দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বৃদ্ধিতে ব্যবহার করতে পারে।

আঞ্চলিক পুরস্কার

পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মতে, দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সুযোগের চেয়ে আঞ্চলিক সুবিধার মধ্যেই প্রকৃত লাভ বেশি নিহিত। কারণ, একটি দীর্ঘস্থায়ী ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি পাকিস্তানের চারপাশের পরিবেশের খোলনলচে বদলে দিতে পারে।

ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য আবার পুরোদমে চালু হতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপে এক দশকের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে।

তবে কূটনৈতিক পরিস্থিতি ইসলামাবাদ যেমনটা প্রকাশ্যে দেখাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

রিয়াদভিত্তিক ‘কিং ফয়সাল সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ’-এর গবেষক উমর করিম বলেন, এমন একটি শূন্যস্থান পূরণ করতে পাকিস্তান এ সংকটে প্রবেশ করেছিল, যা এখন হয়তো সংকুচিত হয়ে আসছে।

উমর করিম বলেন, পাকিস্তান এমন এক সময়ে এই আঞ্চলিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রবেশ করেছিল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন অন্য কোনো সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পাকিস্তান সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পেরেছিল। কারণ, তারা ইরানের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল। পাশাপাশি তারা মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় করে এ মধ্যস্থতা চালিয়েছে, ফলে অঞ্চলের সব বড় শক্তিকে এক করা সম্ভব হয়েছে।

তবে উমর করিম মনে করেন, পাকিস্তানের এই প্রভাবের একটি সীমাবদ্ধতা আছে।

এই গবেষক যোগ করেন, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকাঠামোর সঙ্গে নিজেকে একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত যুক্ত করতে পেরেছে ঠিকই। কিন্তু তারা এখনো এমন কোনো অবস্থানে পৌঁছায়নি, যেখান থেকে তারা ইরানকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কোনো দাবি মেনে নিতে রাজি করাতে পারে।

উমর করিম বলেন, তা ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য সব দেশের সঙ্গে সমানভাবে ভারসাম্য বজায় রাখাও তাদের জন্য কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক হোটেল কমপ্লেক্সে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির
ছবি: রয়টার্স

সুবিধাভোগী কারা

এই কূটনৈতিক তৎপরতার নিচে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে রয়েছে। বুর্গেনস্টকে জেডি ভ্যান্স তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে ফিল্ড মার্শাল মুনিরের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি কোনো বেসামরিক সরকারের অংশ নন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গত চার মাসে পাকিস্তানের যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সুবিধা পেয়েছে, সেটি হলো দেশটির সামরিক বাহিনী।

স্বাধীন দেশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রায় ৮০ বছরের ইতিহাসে ৩০ বছরের বেশি সময় সামরিক বাহিনী সরাসরি দেশ শাসন করেছে। এখনো তারা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাব বজায় রেখেছে। সমালোচকদের চোখে, সেনাপ্রধান, বিশেষ করে ফিল্ড মার্শাল মুনিরই হলেন দেশের মূল চালিকা শক্তি বা নেপথ্য শাসক।

তবে কেউ কেউ যুক্তি দেন, এই কূটনৈতিক সাফল্যের কোনো সুফল যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তবে এর আসল খেসারত দিতে হবে সাধারণ জনগণকেই।

ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, এ কূটনৈতিক তৎপরতার আসল অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা হবে তখনই, যখন এর অর্থনৈতিক লাভ পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে পৌঁছাবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কারণে এই অঞ্চল দুই দশকের বেশি সময় ধরে সশস্ত্র সহিংসতার মুখে পড়েছে।

ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন আল–জাজিরাকে বলেন, অর্থনৈতিক সুফল বেলুচিস্তানের জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া গেলেই কেবল সন্ত্রাসবাদের এ অভিশাপ দূর করা সম্ভব।

তুঘরাল ইয়ামিন আরও বলেন, ‘আমরা এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। অবশ্য এটা ঠিক, অতীতে আমরা এমন বহু সুযোগ হাত ছাড়া করেছি।’