পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির কীভাবে ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হয়ে উঠলেন
পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে খারাপ গেলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই সম্পর্ক উষ্ণ হতে থাকে। এতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের কৃতিত্ব আছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব হলো, তা নিয়ে আল–জাজিরায় লিখেছেন আবিদ হোসেন। আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে গত ৩১ ডিসেম্বর লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।
আলোচনাস্থল ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বাসভবন মার-আ-লাগো। আলোচনার বিষয় ছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতে থাকা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
গত ২২ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আটটি যুদ্ধ থামিয়েছি।’ সেই অনুষ্ঠানে তিনি নিজের নামে একটি নতুন ধরনের ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ তৈরির ঘোষণাও দেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমরা পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ থামিয়েছি।’ তিনি আবার যুক্তি দিচ্ছিলেন, কেন তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনিই ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন। যদিও একসময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ থামানোর দাবি করলেও এখন পর্যন্ত তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধান এবং অত্যন্ত সম্মানিত জেনারেল, যিনি ফিল্ড মার্শাল—তিনি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, হয়তো তার চেয়েও বেশি।’
গত জুন মাস থেকে শুরু করে এ নিয়ে অন্তত ১০ বার ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রকাশ্য প্রশংসা করলেন। ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছে গত অক্টোবরে। তখন ট্রাম্প মিসরের শারম আল-শেখে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষে ভাষণ দিচ্ছিলেন। যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার জন্য বিশ্বনেতাদের ধন্যবাদ জানানোর সময় ট্রাম্প নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে স্বীকৃতি দেন এবং এরপর আসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে উল্লেখ করেন।
বছরের শুরুর দিকে আরও বেশ কয়েকবার ট্রাম্প ফিল্ড মার্শাল মুনিরকে ‘একজন দুর্দান্ত যোদ্ধা’, ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ এবং ‘অসাধারণ মানুষ’—এমন নানা বিশেষণ দিয়ে প্রশংসা করেছেন। জুনে তাঁদের প্রথম বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে পেরে তিনি ‘সম্মানিত’।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের প্রতি এই প্রকাশ্য উষ্ণতা প্রমাণ করে, ২০২৫ সালে দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ভাবমূর্তির নেপথ্যে মুনির ছিলেন প্রধান চালিকা শক্তি। কেউ কেউ তাঁকে দেশের কূটনৈতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলতে থাকা তিক্ত সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপান্তর করার কৃতিত্ব দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক কয়েক বছর আগেও খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। তবে এখন সম্পর্ক উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সেই উষ্ণ সম্পর্ক এখন কেবল নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন ক্রিপ্টো মাইনিং এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মতো অর্থনৈতিক বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
অনেক বিশেষজ্ঞ এই পরিবর্তনের সূত্রপাত হিসেবে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সশস্ত্র সংঘাতকে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে, এটি সম্পর্কোন্নয়নের চূড়ান্ত মোড় ছিল।
ভারত–পাকিস্তান উভয় দেশই সেই আকাশযুদ্ধে ‘বিজয়’ দাবি করেছিল; কিন্তু কে জিতেছে সেটা বড় কথা নয়, ইসলামাবাদ এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পেরেছে—বিশ্লেষকেরা এমনটাই মনে করেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের অনেকেও এই একই মত পোষণ করেন।
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খুররম দস্তগীর খান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সংঘাতই সেনাপ্রধানের প্রোফাইল বা গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত কারণ ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই জয় এমন কিছু বিষয়কে গতি দিয়েছে, যা আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল, যার কিছুটা ট্রাম্পের বিশেষ চরিত্রের কারণেও হয়েছে।’
স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
ভারত ও পাকিস্তান দুই প্রতিবেশী দেশই পারমাণবিক শক্তিধর। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশক ধরে শত্রুতা চলছে। তারা এর আগে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। এ বছরের শুরুতে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এপ্রিলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এরপরই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংকট দেখা দেয়।
ভারত ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং একটি ‘নির্ভরযোগ্য, স্বাধীন ও স্বচ্ছ’ তদন্তের দাবি জানায়; কিন্তু গত ৭ মে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে এবং পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলা চালিয়ে বসে। পাকিস্তানও বিমান হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেয়। ইসলামাবাদ দাবি করে, তারা ভারতের অন্তত ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত কয়েক দিন পর বিমান হারানোর কথা স্বীকার করলেও সংখ্যা জানায়নি।
পরবর্তী তিন দিন পাল্টাপাল্টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে সংঘাত আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত, বিশেষ করে পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো কূটনীতির ফলে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
পাকিস্তান এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব ওয়াশিংটনকে দেয়। পরে তারা ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। তবে ভারত দাবি করে, এই যুদ্ধবিরতি কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই হয়েছে। দিল্লি দীর্ঘকাল ধরেই বলে আসছে, ভারত-পাকিস্তানের যেকোনো সমস্যা কেবল নিজেদের মধ্যেই সমাধান করতে হবে।
তবে মে মাসের পর থেকে ট্রাম্প বারবার এই সংঘাতের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি ৫০ বারের বেশি দাবি করেছেন, তিনি এই যুদ্ধবিরতি করিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পাকিস্তানের দাবিকেও সমর্থন করেছেন।
খুররম দস্তগীর খান বলেন, দিল্লি ট্রাম্পকে এই যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দিতে রাজি না হওয়ায় একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, যা সেনাপ্রধান মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শরিফ খুব দ্রুত কাজে লাগিয়েছেন।
সাবেক পাকিস্তানি পররাষ্ট্রসচিব সালমান বশির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুররমের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, মে মাসের সংঘাত ছিল একটি ‘সুস্পষ্ট মোড়’। ট্রাম্প একজন ‘ব্যতিক্রমী প্রেসিডেন্ট’। মুনিরের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ ও ভারতের সঙ্গে সংঘাত—এ দুই মিলে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন রূপ পেয়েছে।
সালমান বশির আল–জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভাগ্য পুনরুদ্ধারে আসিম মুনির হলেন মূল কেন্দ্রবিন্দু।’
পরিবর্তনের প্রথম লক্ষণ
পাকিস্তান একসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পর দেশটিকে ‘ন্যাটো–বহির্ভূত প্রধান মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই সম্পর্ক খারাপ হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে’ দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ আনেন। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও প্রতারণা’ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন।
ট্রাম্পের উত্তরসূরি জো বাইডেনও পাকিস্তানকে ‘বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পুরোপুরি ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণ, ওয়াশিংটন ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে দেখছিল।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায় ট্রাম্পের সুর বদলে যায়। গত মার্চে কংগ্রেসের এক যৌথ অধিবেশনে তিনি কাবুল বিমানবন্দরে ২০২১ সালের আগস্টে বোমা হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। ওই হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা ও বহু আফগান নাগরিক নিহত হয়েছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এই দানবকে গ্রেপ্তার করতে সহায়তা করার জন্য, বিশেষ করে পাকিস্তান সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
ইসলামাবাদভিত্তিক সনোবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমা বলেন, এটি ছিল পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সংকেত। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সব সময় এমন একজন মিত্র প্রয়োজন ছিল, যারা তাদের সন্ত্রাসবাদবিরোধী লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করতে পারে। তারা ভারতকে গত কয়েক বছর সমর্থন দিলেও অ্যাবে গেট বোমা হামলাকারী গ্রেপ্তারের পর তারা বুঝতে পেরেছে, লক্ষ্যপূরণে পাকিস্তানই সক্ষম।’
কামার চিমা আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় ফিল্ড মার্শাল একজন সৈনিক-কূটনীতিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। মুনির তাঁর সামরিক-কূটনৈতিক দক্ষতা ব্যবহার করে পাকিস্তানের হয়ে ওকালতি করেছেন।’
সেনাপ্রধানের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ক্ষমতা দেশের ভেতরে তাঁর শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রতিফলন।
ফিল্ড মার্শালের প্রভাব বিস্তার
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। চারটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং কয়েক দশকের প্রত্যক্ষ শাসন তাদের এই আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করেছে। এমনকি বেসামরিক সরকারের আমলেও সেনাপ্রধানকে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত মে মাসে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের পর মুনিরকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করা হয়, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো কর্মকর্তার ভাগ্যে জুটল। বছরের শেষ দিকে সংবিধান সংশোধন করে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদ তৈরি করা হয়। এর ফলে সেনাপ্রধানের পাশাপাশি তিনি একই সঙ্গে সিডিএফের দায়িত্ব পালন করবেন। এর ফলে নৌ ও বিমানবাহিনীও মুনিরের অধীন চলে আসে।
এসব পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দল ও বিশ্লেষকেরা সমালোচনা করলেও আবার এটাও ঠিক, সারা বছর ধরে পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পর্ক বেশ গতি পেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে পাকিস্তান। উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরসহ বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের সফর হয়েছে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল।
আসিম মুনির, শাহবাজ শরিফসহ পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতারা মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের (আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান) সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে। জুনে মুনিরের সঙ্গে দেখা করার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘পাকিস্তানিরা ইরানকে খুব ভালো চেনে, অন্যদের চেয়ে ভালো।’
টাফ্টস ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ফাহদ হুমায়ুন বলেন, এসব ঘটনা প্রমাণ করে, পাকিস্তান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তার গুরুত্ব আবার ফিরে পেয়েছে। তিনি দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন—এক. মধ্যপ্রাচ্যে (গাজা ও ইরান) ওয়াশিংটনের নতুন করে মনোযোগ দেওয়া; দুই. মে মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য।
হুমায়ুন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মুনির এসব সুযোগ খুব দ্রুত কাজে লাগিয়েছেন। তিনি ভারত এবং ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মতো বিষয়গুলোকে ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের ভেতরে নিজের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছেন।’
পাকিস্তান গাজায় শান্তিরক্ষায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত আন্তর্জাতিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছে। মুনির কাতার, মিসর, জর্ডান, আরব আমিরাত ও লিবিয়ার সামরিক নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে সেপ্টেম্বরে, যখন মুনির ও শরিফ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় দুই দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে।
কামার চিমা বলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আরও দুবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করে পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন আসিম মুনির।
বিদেশে লাভ, ঘরে চড়া মূল্য
কেউ কেউ বলছেন, পাকিস্তানের কূটনৈতিক মর্যাদা কয়েক দশকের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। খুররম দস্তগীর দাবি করেন, পাকিস্তান এখন বিশ্বের গুটিকয় দেশের একটি, যারা যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, সৌদি আরব, রাশিয়া—সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখছে। তিনি মনে করেন, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করেছে।
তবে অনেকে কিছুটা সন্দিহান। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সালমান বশির বলেন, ‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বর্তমানে আমরা গণতন্ত্রের কথা কম এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের কথা বেশি শুনছি।’
ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটনের মারিয়া রশিদ বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সামরিক প্রেম নতুন কিছু নয়। যখনই স্বার্থ মিলে যায়, তখনই এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছে।’
এর আগে আশির দশকে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে এবং ২০০১ সালের পর ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে’ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিলেন জেনারেল জিয়া-উল-হক ও পারভেজ মোশাররফ। সমালোচকেরা বলেন, সেই সমর্থন মূলত তাঁদের সামরিক শাসনকেই শক্তিশালী করেছিল।
বিদেশে কূটনৈতিক সাফল্য বাড়লেও পাকিস্তানের ভেতরে ২০২৫ সালে সহিংসতা অনেক বেড়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন প্রদেশগুলোতে নিহতের সংখ্যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, সরকার নাগরিক স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছে।
২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাস হওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সমালোচকরা বলছেন, এটি আসিম মুনিরকে সিডিএফ হিসেবে অপরিসীম ক্ষমতা দিয়েছে। তাঁকে আজীবন দায়মুক্তি দিয়েছে এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তবে কামার চিমা মনে করেন, সামরিক বাহিনীর সংস্কার ও সংহতির জন্য এটি প্রয়োজন ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস ও তাঁর দলের ওপর দমন-পীড়ন নিয়েও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। মারিয়া রশিদ বলেন, মে মাসের সংঘাত মুনিরের জন্য সঠিক সময়ে এসেছিল। কারণ, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেনাবাহিনীর জনপ্রিয়তা বেশ কম ছিল।
মারিয়া আরও বলেন, বৈদেশিক সাফল্য এখন দেশের ভেতরের অস্বস্তিকর ইস্যুগুলোকে সেনাবাহিনীর জন্য আড়ালে পাঠিয়ে দিয়েছে। ইমরান খানের কারাবাস, সংবিধান সংশোধন বা বেলুচিস্তানের বিদ্রোহের মতো খবরগুলো এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তানের ‘সাফল্যের’ আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।