আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি শহরে পাকিস্তান বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই হামলার ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিদ্যমান নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। পাকিস্তান বলেছে, তারা বারবার আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষকে তাদের মাটি ব্যবহার করে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দমনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু কাবুল ‘কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে’ ব্যর্থ হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণ
পাকিস্তানে গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের কিছু হামলার পর সীমান্ত পেরিয়ে এই পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বান্নুতে একটি নিরাপত্তা সামরিক বহর লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন।
এর আগে গত সপ্তাহে আরেক আত্মঘাতী হামলায় ১১ সেনাসদস্য ও এক শিশু প্রাণ হারায়। কর্মকর্তারা পরে হামলাকারীকে আফগান নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের তারলাই কালান এলাকার ‘খাদিজাতুল কুবরা’ মসজিদে জোহরের নামাজের সময় এক আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে অন্তত ৩১ জন মুসল্লি নিহত ও ১৭০ জন আহত হন।
ইসলামাবাদের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুল্লাহ খান মনে করেন, পাকিস্তানের এ হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে, কাতার, তুরস্ক, এমনকি সৌদি আরবের মধ্যস্থতাও পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনা নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে।
নতুন ‘প্রতিরোধ কাঠামো’
গত বছরের অক্টোবরেই বিশ্লেষকেরা লক্ষ করেছিলেন, আফগান মাটি থেকে পরিচালিত হামলায় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তা ইসলামাবাদের জন্য উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্যমতে, কেবল ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেই পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ২ হাজার ৪ শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। এটি গত এক দশকে দেশটির জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছরে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
কয়েক বছর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিদায়ের পর থেকেই পাকিস্তানে হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ইমরান খানের প্রশাসন টিটিপির সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। তাঁর মেয়াদকালেই সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও হামলার মাত্রা তুলনামূলক কম ছিল।
আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে টিটিপি যোদ্ধাদের আস্তানা লক্ষ্য করে ইসলামাবাদ দফায় দফায় বিমান হামলা শুরু করলে সম্পর্কের আরও অবনতি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর টিটিপির ক্রমবর্ধমান হামলাগুলোই সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের মূল কারণ।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসলামাবাদ এখন নতুন এক ‘প্রতিরোধ কাঠামো’ তৈরির চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে তারা এই বার্তাই দিতে চায়, টিটিপি বা অন্য যেকোনো গোষ্ঠীই হোক না কেন, আফগানিস্তান থেকে কোনো হামলা চালানো হলে কাবুলকে তার চরম মূল্য দিতে হবে।
এ ছাড়া দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার এই উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়েছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে বহিষ্কারের ঘটনায়। কয়েক দশকের যুদ্ধ ও সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ৩০ লাখ আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন, যা বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাড়তি বিরোধের সৃষ্টি করেছে।
ভারতের ভূমিকা
গত অক্টোবর মাসে যখন সীমান্ত সংঘর্ষ চলছিল, ঠিক তখনই আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি প্রথমবারের মতো ভারত সফর করেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কাবুলভিত্তিক বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস মনে করেন, ভারতে মুত্তাকিকে যেভাবে উচ্চপর্যায়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তা সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় ধরনের হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের পেছনে একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
পরবর্তী পরিস্থিতি কী
টিটিপির উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ালেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ বড় কোনো যুদ্ধের রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম। পাকিস্তানের তুলনায় আফগানিস্তানের প্রথাগত সামরিক শক্তি অনেক কম। তা ছাড়া দুই পক্ষই উত্তেজনা প্রশমনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা শিগগিরই থামছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, পাকিস্তান স্পষ্ট সংকেত দিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসে যারা তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে, সেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তারা অভিযান অব্যাহত রাখবে।