বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দেশটি এখন চরম স্বাস্থ্যগত সংকটের মুখে। এর মধ্যে সিন্ধু প্রদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল। এখানে স্বাস্থ্যগত সংকটের মুখে পড়া হাজারো পরিবারের একটি নুর জাদির পরিবার। এখানকার মানুষ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ায় ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে সেখানে বন্যার জমে থাকা পানির পাশে খোলা জায়গায় বসবাস করতে হচ্ছে।
সিন্ধু প্রদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রদেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গু জ্বরে অন্তত ৩ হাজার ৮৩০ জন আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

default-image

প্রদেশটির থাট্টা জেলা হাসপাতালের জরুরি ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা নেওয়া শিশু শুধু সাঈদই একা নয়; নুর যে বিছানায় বসা, তার আরেক প্রান্ত বসে আছেন আরেক মা। তাঁর ছেলের হাতও ড্রিপের সঙ্গে আটকানো।

হাসপাতালের মেডিকেল কর্মকর্তা আশফাক আহমেদ বলেন, এ ওয়ার্ডের প্রায় সবাই শিশু। তারা প্রায় সবাই বন্যাসংশ্লিষ্ট অসুখবিসুখে আক্রান্ত। তবে এখানে ম্যালেরিয়ার ওষুধের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
সাঈদের পাশের বিছানায় শায়েস্তা নামের এক নারী চুপচাপ শুয়ে ছিলেন। তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বন্যাপ্রবণ এলাকা থেকে এসেছেন তিনি। তাঁর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে আরও দূরে একটি বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানান চিকিৎসক।

হাসপাতালে কয়েক মিনিট পরপর নতুন রোগী আসছে। গোলাম মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি ওয়ার্ডে প্রবেশ করতেই তাঁর কোলে থাকা দুই বছরের নাতনি সায়মা দাদার কাঁধ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমার বাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত। এখন যেই ক্যাম্পে থাকছি, সেখানকার ডাক্তারের কাছে তাকে নিয়ে যাই। কিন্তু তাঁরা কিছু করতে পারেননি, তাই এখানে নিয়ে এসেছি।’

গোলাম মোস্তফা হাসপাতালে আসতে পারলেও সবাই সেই সুযোগ পাচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে আধঘণ্টা দূরে প্রদেশের দমদামা এলাকায় একটি শিবির পরিদর্শন করেন সাংবাদিকেরা। সেটি এখন কয়েক হাজার বন্যার্ত মানুষের আবাসস্থল হয়ে উঠেছে।

বিবিসির এ প্রতিবেদক বলেন, ওই এলাকায় যাওয়ার পথে দেখা যায়, জমিজমা সব পানির নিচে। আর কিছু কিছু বাড়ির ছাদ পানির নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে। একটি নদীর তীর অতিক্রম করার সময় তীরজুড়ে অস্থায়ী তাঁবুর সারি দেখা যায়, যা সেকেলে উপায়ে নির্মিত। লাঠির ওপর কোনো রকমে কাপড়ের টুকরা ঝুলিয়ে বা পাতা দিয়ে তাঁবুর কাঠামো তৈরি করে সেখানে গৃহহীনেরা থাকছে। প্রচণ্ড গরমে এই তাঁবু কিছুটা স্বস্তি দিলেও বৃষ্টির কথা বাদই দিতে হবে। এখানে যারা থাকছে, তাদের অনেকের বয়সই কম। সাংবাদিকেরা ক্যাম্পের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে ছুটে এসে জানতে চায়, তাঁরা চিকিৎসক কি না।

default-image

এক নারীর কোলে ছিল তাঁর ছোট্ট ছেলে। কয়েক দিন ধরে শিশুটির জ্বর। আর এই মা জানেন না কী করতে হবে। কোনো রকমে হাতে বানানো জোড়াতালি দেওয়া আরেকটি তাঁবুর নিচে রাশিদা নামের এক নারী তাঁর সাত সন্তানকে নিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন। সাত সন্তানের চারজনই অসুস্থ। এখন রাশিদা আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি গর্ভে থাকা সন্তানকে নিয়ে চিন্তিত।  আর অসুস্থ সন্তানদের হাসপাতালে নেওয়ার মতো অর্থও তাঁর হাতে নেই।

রাশিদা বলেন, ‘তাদের জ্বর, বমি করছে...প্রচুর মশা তাদের কামড়াচ্ছে। আমার বাচ্চারা দুধের জন্য কাঁদছে।’ তিনি জানান, তিনি কোনো ধরনের খাদ্যসহায়তা অথবা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁবু পাননি। রাশিদার মতো অনেকেরই একই ধরনের গল্প। তাদের অনুভূতি, তাঁরা হয়তো ‘পরিত্যক্ত’।

default-image

থাট্টার একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ডা. গজানফর কাদরি স্বীকার করেছেন যে সেখানে তাঁবুর অভাব রয়েছে, কিন্তু বলেছেন, যতটা সম্ভব এলাকায় খাদ্যসহায়তা পাঠানো হচ্ছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গা থাকতে পারে, যেখানে ত্রাণ পৌঁছায়নি। কিন্তু আমার জানামতে, পুরো এলাকাতেই রেশন দেওয়া হয়েছে।’

সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা রাশিদাকে গজানফর কাদরির এসব আশ্বাস কিছুটা স্বস্তি দেয়। বন্যার পানিতে উপচে পড়া নদীর ওপার দেখিয়ে রাশিদা বলেন, সেখানে একসময় থাকতেন। এখন তাঁর কিছুই নেই। বলেন, ‘আমাদের ঘর ভেসে গেছে। আমাদের কিছুই নেই।’

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন