পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত: তৃতীয় দিনেও সংঘাত অব্যাহত, ইসলামাবাদকে সমর্থন ওয়াশিংটনের
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আফগানিস্তানের তালেবান সেনাদের মধ্যে আজ শনিবার তৃতীয় দিনের মতো পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। তবে দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত থামাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংঘাত সহসা বন্ধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইসলামাবাদ বলেছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করলে কাবুলের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। তবে তালেবানের নেতারা বলেন, সংঘাত বন্ধে কাবুল জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর সংঘাতে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশটি ‘খুব ভালো করছে’। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার’ অধিকার আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, আফগানিস্তানের হামলাকে ওয়াশিংটন ‘আগ্রাসন’ হিসেবে দেখছে না। তবে সংঘাত বেশি দূর গড়াবে না বলে মনে করে ওয়াশিংটন।
গত শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটা থেকে আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশের ১৩টি স্থানে ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সেনা ও তালেবান বাহিনীর মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হয়। আফগানিস্তানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালেবান বাহিনী সীমান্ত-সংলগ্ন মিরানশাহ এবং স্পিনওয়ামের পাকিস্তানি সামরিক ক্যাম্পে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান টিভি জানিয়েছে, ড্রোন হামলার জবাবে পাকিস্তানি বাহিনী আফগান তালেবানদের বেশ কয়েকটি অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি, তাঁদের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৩৩১ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছেন। পাকিস্তানি বাহিনী ১০৪টি চেকপোস্ট ও ১৬৩টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করার পাশাপাশি আরও ২২টি চেকপোস্ট নিজেদের দখলে নিয়েছে।
আফগান তালেবানের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে খোস্ত, পাকতিকা, নানগারহারসহ বিভিন্ন প্রদেশে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে নারী, শিশুসহ অন্তত ৫২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৬৬ জন আহত হয়েছেন। হামলায় আটটি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। পাকিস্তানের এই হামলার জবাবে গত বৃহস্পতিবার রাতে তালেবান বাহিনী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানের নানা স্থানে বড় ধরনের পাল্টা হামলা চালায়। তালেবানের দাবি, তারা ২৭টি পাকিস্তানি সামরিক পোস্ট দখল এবং ৮২ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা
পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। শুক্রবার রাতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ফোনালাপ করেন। এর আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গেও কথা বলেন।
আল-জাজিরা জানায়, গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের প্রতি উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সহিংসতা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও জর্ডানও সংঘাত বন্ধের জন্য ইসলামাবাদ ও কাবুলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ দুটি সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। শুক্রবার বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক, কাতারের কূটনীতিকেরাও উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনালাপ করেন। চীন, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়াও সংঘাত থামানোর জন্য আহ্বান জানায়। তারা সংঘাত না বাড়িয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথ খোঁজার পরামর্শ দেয়।
আফগানিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় রাজনৈতিক পরিচালক জাকির জালালি বলেন, ‘বৈধ ও দায়িত্বশীল’ সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ‘সক্রিয় কূটনীতি’ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ‘বিস্তারিত’ আলোচনা হয়েছে।
‘কোনো সংলাপ নয়’
আফগান তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানালেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি সেই আলোচনার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু কাবুল তা অস্বীকার করেছে।
পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের
আফগানিস্তানে পাকিস্তানের চলমান হামলাকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র; বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’কে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র এক ই-মেলে রয়টার্সকে বলেন, ‘তালেবান একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তাদের হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র।’ মার্কিন কূটনীতিক অ্যালিসন হুকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, তিনি শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালোচের সঙ্গে কথা বলেছেন।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ওয়াশিংটন উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং পাকিস্তান ও আফগান তালেবানের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রাণহানির ঘটনায় মর্মাহত। তিনি যোগ করেন, তালেবানরা ক্রমাগতভাবে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আফগানিস্তানের মাটিকে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করছে। আফগানিস্তান এ দাবি অস্বীকার করেছে।