খাইবার পাখতুনখাওয়া নিয়ে শাহবাজ-জারদারির বৈঠকে কী আলোচনা হলো, কেন্দ্রের শাসন কি বলবৎ হচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। প্রেসিডেন্ট ভবন, পাকিস্তান, ১০ অক্টোবর ২০২৬ছবি: পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

পাকিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ শনিবার আলোচনায় বসেছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ নিয়ে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন চলছে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে কেন্দ্রীয় সরকারে শাসন জারির হুমকিও এসেছে। এর মধ্যেই দুই নেতা এ আলোচনা করলেন।

প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, দুই নেতা প্রেসিডেন্ট ভবন আইওয়ান-ই-সদরে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা ‘দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।’

বৈঠকে সরকার ও পিপিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, অ্যাটর্নি জেনারেল মনসুর উসমান আওয়ান, আইন ও বিচারমন্ত্রী আজম নাজির তারার, সিনেটর শেরি রেহমান প্রমুখ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বৈঠকে মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের আলাদা অধিবেশন ডাকার বিষয়ে একমত হওয়া গেছে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, এর আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজলের (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান টেলিফোনে কথা বলেন। কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্যমতে, ওমরাহ পালন করায় শাহবাজ মাওলানা ফজলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি ফজলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানান। জেইউআই-এফের প্রধান আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। শিগগিরই এ বৈঠক হওয়ার কথা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন ফজলুর রহমান।’

জেইউআই–এফের মিডিয়া সেল থেকে দলটির মুখপাত্র আসলাম গৌরির একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে তিনি বলেন, দুই নেতা চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্র ও খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গৌরি আরও বলেন, ফজলুর রহমান পিটিআইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি পিটিআই নেতৃত্বকে আস্থায় নিয়েছেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিও পাকিস্তান জানায়, এর আগে আজ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানবিষয়ক মন্ত্রী আমির মুকাম ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি পেশোয়ারের গভর্নর হাউসে বৈঠক করেন।

বৈঠকে তাঁরা খাইবার পাখতুনখাওয়ার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান লংমার্চ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দুই নেতা বলেন, জনগণ ‘বিশৃঙ্খলার রাজনীতি’ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বৈঠক শেষে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, প্রদেশটিতে শান্তি নিশ্চিত করতে এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়ন এগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেবে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা

সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আবার আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে শনিবার পিটিআইয়ের লংমার্চ চারসাদ্দা থেকে মারদানে যাওয়ার কথা। এমন সময়েই এসব যোগাযোগ হলো।

আলোচনা আবার শুরুর চেষ্টার মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে এসেছেন ফজলুর রহমান। পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া শাখার সভাপতি জুনাইদ আকবর বলেন, সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে মধ্যস্থতার জন্য দলটি জেইউআই–এফের প্রধানকে দায়িত্ব দিয়েছে। আর পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান নিঃশর্ত আলোচনার আহ্বান জানান। তিনি দুই পক্ষকে সামনে এগোনোর পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।

এর আগে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে দুই দফা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। দুই পক্ষের মতভেদ ছিল দুটি বিষয়ে। একটি হলো কারাবন্দী প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার পিটিআইয়ের দাবি। অন্যটি হলো সন্ত্রাসবিরোধী নীতি নির্ধারণে খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের ভূমিকা। পিটিআই বলেছে, কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারকে নিয়ে যৌথ কৌশল দরকার। অন্যদিকে সরকারের অবস্থান ছিল, প্রাদেশিক প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য।

লংমার্চ এগোনোর মধ্যেই আলোচনা আবার শুরুর চেষ্টা চলছে। পিটিআইয়ের নেতারা নতুন করে আলোচনার জন্য চাপ দিচ্ছেন। আর সরকারের নেতারা দলটিকে বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানাচ্ছেন।

সমঝোতার প্রাথমিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ৪ অক্টোবর লংমার্চ শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বহরটি চারসাদ্দা ও মারদান হয়ে সোয়াবি পৌঁছাবে। পিটিআই জানিয়েছে, সোয়াবি পৌঁছানোর পর তারা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবে।

এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সম্ভাব্য জরুরি পদক্ষেপ এবং প্রদেশটির প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন নিয়ে জল্পনাও উসকে দিয়েছে। সূত্রের বরাতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ১২টি জেলার জন্য আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ার একটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থাসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে।