আমিরাতে বিতাড়নের শিকার পাকিস্তানের শিয়ারা, জমানো অর্থ–লাগেজ কিছুই আনতে পারেননি
পাকিস্তানের চকওয়াল অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের শতাধিক মানুষ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছেন। তাঁরা যে আমিরাতে শুধু তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন তা নয়, ফেরার সময় তাঁরা তাঁদের লাগেজ এবং বিদেশে বহু বছর ধরে জমানো অর্থও আনতে পারেননি।
সম্ভবত ইরান যুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হাজারো শিয়া মুসলিমের অংশ তাঁরা।
এ ঘটনায় পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের দিক থেকে ইরানের পরই পাকিস্তানের অবস্থান। দেশটিতে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৪ কোটি মানুষ আছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১০৩ জন পাকিস্তানি নাগরিকের অভিবাসনসংক্রান্ত নথি, ভিসার স্ক্রিনশট ও ফ্লাইটের তথ্য পর্যালোচনা করেছে। তাঁরা সবাই নিজেদের শিয়া মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে তাঁদের সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রয়টার্স তাঁদের মধ্য থেকে ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই বলেছেন, আমিরাত থেকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তাঁরা নিজেদের লাগেজ বা সঞ্চিত অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ পাননি। বিতাড়নের শিকার হওয়া আরও বেশ কয়জন শিয়া মুসলিমের সঙ্গে একই ফ্লাইটে তাঁদের তুলে দেওয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানের শিয়া রাজনৈতিক সংগঠন মজলিশ ওয়াহদাত-ই মুসলিমিনের তৈরি একটি তথ্যভান্ডার পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। এতে দেখা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় আরব দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭ হাজার ৫০০ পাকিস্তানি শিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সংগঠনটির মুখপাত্র মহসিন আবিদি বলেছেন, প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়েও অনেক বেশি।
শিয়াদের দাবি, বিতাড়নের ঘটনা বেড়েছে
পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর বিতাড়নের ঘটনা আরও বেড়েছে। এই সংঘাতের কারণে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আমিরাত কর্তৃপক্ষ কিসের ভিত্তিতে পাকিস্তানি শিয়াদের বিতাড়নের জন্য বেছে নিয়েছে, তা রয়টার্স জানতে পারেনি।
এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্নের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিতাড়িত করেনি। তাদের দাবি, যাঁদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা আমিরাতের নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন।
সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই বলেছেন, আমিরাত থেকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তাঁরা নিজেদের লাগেজ বা সঞ্চিত অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ পাননি। বিতাড়নের শিকার হওয়া আরও বেশ কজন শিয়া মুসলিমের সঙ্গে একই ফ্লাইটে তাঁদের তুলে দেওয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, চলতি বছর বিতাড়নের সংখ্যা ‘স্বাভাবিক পর্যায়েই’ আছে। তবে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।
তবে পাকিস্তান সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি বিষয়টির স্পর্শকাতরতার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি, তিনি বলেছেন, আমিরাত থেকে হাজারো পাকিস্তানিকে ফেরত পাঠানোর পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে ইসলামাবাদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিয়া মুসলিম।
ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক কারণে’ পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে বিষয়টি তোলেনি। যদিও এ বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের উপপরিচালক মাইকেল পেজ বলেছেন, ‘আমিরাতে বসবাসকারী পাকিস্তানি শিয়াদের বিতাড়িত করার খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগের।’ তিনি আরও বলেন, সংস্থাটি এসব ‘গুরুতর অভিযোগ’ তদন্ত করছে।
প্রবাসী পাকিস্তানিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ওভারসিজ পাকিস্তানিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ লাখ পাকিস্তানি সংযুক্ত আমিরাতে বসবাস ও কাজ করেন। তাঁরা পাকিস্তানে বছরে ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করছে পাকিস্তান।
শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের দিক থেকে ইরানের পরই পাকিস্তানের অবস্থান। দেশটিতে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৪ কোটি মানুষ আছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ।
অপরদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সুন্নিশাসিত রাষ্ট্র।
মেনা রাইটস গ্রুপের মানবাধিকার কর্মকর্তা ফালাহ সায়েদ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন নতুন কিছু নয়। সংগঠনটি বহু বছর ধরে বিদেশি শিয়া নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘স্বেচ্ছাচারী আটক ও গুমের’ ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় এই দমন-পীড়ন আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আইটি খাতে কাজ করতে ২০২৪ সালে দুবাইয়ে যান শিয়া দম্পতি আলী আহমেদ নাকভি এবং তাঁর স্ত্রী কুররাতুল আইন। নাকভি বলেন, কাজ পরিবর্তনের সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে ভিসা হালনাগাদের আবেদন করার পর তাঁর স্ত্রী গত ১৮ এপ্রিল আটক হন। পরে তাঁকে বিতাড়িত করা হয়।
নাকভি বলেন, তিনি নিজেও পাকিস্তানে ফেরার ফ্লাইটে ওঠার সময় আটক হয়েছিলেন। পরে তাঁকে আমিরাতের একটি আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে বিতাড়নের অপেক্ষায় থাকা আরও শিয়া সম্প্রদায়ের আরও অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়।। তাঁকে আটকাবস্থায় থাকা ৯৩ জন ব্যক্তির সঙ্গে একই ফ্লাইটে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। ৯৩ জনের সবাই শিয়া মুসলিম ছিলেন।
নাকভি বলেন, ‘আমাদের কাউকেই বলা হয়নি যে কেন আমাদের বের করে দেওয়া হচ্ছে।’
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিয়া অধ্যুষিত কুররাম এলাকার কমিউনিটি নেতা মুসারাত হোসেন বাঙ্গাশ বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ওই অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁদের অনেকেই পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন।
পাকিস্তানের চকওয়াল এলাকার ৩৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেছেন, তিনি দুবাই মেট্রোর ব্যবস্থাপক ছিলেন। ১৬ বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকার পর তিনি। বিতাড়িত হয়েছেন।
দুবাই মেট্রোর সাবেক এ ব্যবস্থাপক বলেন, পুলিশ তাঁর মুঠোফোনগুলো নিয়ে নেয়, তাঁকে হাতকড়া পরানো হয় এবং ৯ দিন আটক রাখার পর একটি অন্ধকার ও গাদাগাদি হয়ে থাকা বাসে করে বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
এ ব্যবস্থাপক আরও বলেন, ‘চোখের পলকে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’