‘মানবিকতা কোথায়’: কারাবন্দী ইমরান খানকে নিয়ে ছেলেদের শঙ্কা
প্রায় ছয় মাস ধরে বাবার কণ্ঠস্বর শোনেননি সুলাইমান ও কাসিম খান।
কারাবন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট কিংবদন্তি ইমরান খানের সঙ্গে তাঁদের সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত মার্চে, ঈদুল ফিতরের সময়। সেই ফোনালাপ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ২০ মিনিট।
‘আমরা জানি না কথা বলার জন্য ঠিক কতটুকু সময় পাব,’ লন্ডনে আল-জাজিরাকে বলেন ২৭ বছর বয়সী কাসিম। ‘সাধারণত এটি ২০ মিনিটের মতো হয়। তিনি ব্যাকুল হয়ে আমাদের খোঁজখবর নেন এবং নানা উপদেশ দেন। কিন্তু যখন আমরা তাঁর সম্পর্কে জানতে চাই, তিনি দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন। মনে হয়, তিনি কেমন আছেন, তা নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চান না।’
‘তুমি জানো, এটা এ রকমই,’ বাবার বলা কথাগুলো স্মরণ করেন কাসিম।
রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিন বছর পার করেছেন ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘুষ নেওয়া, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস এবং বেআইনিভাবে রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রির অভিযোগ। তবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একটি ছাড়া তাঁর বাকি সব দণ্ডই স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। আর আপিলগুলো এখনো বিচারাধীন।
ইমরান খানের পরিবার এবং তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) মনে করে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইমরান খানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
সম্প্রতি ইমরান খানের দুই বোন উজমা ও নওরিনকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা জানিয়েছেন, কয়েক মাসের মধ্যে এটাই ছিল তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ।
‘বাবাকে এতটা অস্থির দেখে তাঁরা দুজনই বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন। নির্জন কারাবাসের মাধ্যমে তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে,’ বলেন ২৯ বছর বয়সী সুলাইমান।
‘কারাকক্ষে তাঁর হৃৎস্পন্দন অনেক বেড়ে যায়। তীব্র উদ্বেগের কারণে তাঁর বুক ধড়ফড় করে,’ বলেন কাসিম। তিনি আরও বলেন, ‘আমার জানামতে তিনি সবচেয়ে শান্ত এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় একজন মানুষ। তিনি উদ্বেগে ভুগছেন, এমনটা শোনাও অকল্পনীয়।’
গত ফেব্রুয়ারিতে ইমরান খানের আইনজীবীরা বলেছিলেন, ইমরান তাঁর ডান চোখের ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
‘সেদিন যখন আমাদের ফুফুদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, তখনো তাঁর চোখে পট্টি (আই প্যাচ) লাগানো ছিল,’ বলেন সুলাইমান। তিনি আরও বলেন, ‘টানা ১০ মাস তাঁকে কোনো দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। বোনদের সঙ্গে ওই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া ছাড়া আদালতের আর কোনো নির্দেশই মানা হয়নি।’
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আল-জাজিরাকে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইমরান খানের পরিবারের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবারের অভিযোগ ছিল, ইমরান খানকে উপযুক্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে অথবা ‘তাঁর শারীরিক পরীক্ষার বিষয়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা পালনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে’।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়’ নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। এতে আরও বলা হয়, সরকার ‘কখনো কারও স্বাস্থ্যের প্রতি অসম্মানজনক মনোভাব দেখায়নি’।
১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ আদেশ দেন যে দুই দিনের মধ্যে ইমরান খানকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। তাঁকে প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার এবং সপ্তাহে দুবার ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। আদালত আরও নির্দেশ দেন, তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বোনকে (যাঁরা দুজনই পেশায় চিকিৎসক) তাঁর চিকিৎসায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। এর আগে হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞদের একটি বোর্ড পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল যে ইমরান খানের রক্তচাপ ওঠানামা করছে এবং তিনি উদ্বেগে ভুগছেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
কিন্তু এর বদলে ইমরান খানকে একটি সরকারি হাসপাতালে (পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস–পিআইএমএস) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত শারীরিক পরীক্ষার পর ২০ আগস্ট তাঁকে আবারও কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে ইমরান খানের দল আদালত অবমাননার একটি পিটিশন দায়ের করেছে।
এ বিষয়ে ইমরানপুত্র সুলাইমান বলেছেন, ‘এই সরকারি চিকিৎসকদের মূলত শিখিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের কী বলতে হবে। আমরা চাই স্বাধীনভাবে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হোক, যাতে আমাদের কাছে প্রমাণ থাকে। তারা কী লুকাচ্ছে?’
‘এস্টাবলিশমেন্টের হাতে এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো প্রচেষ্টাই এখন অকার্যকর মনে হচ্ছে,’ বলেন কাসিম। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু বিষয়টি নিয়ে যতটা সম্ভব সরব হওয়ার চেষ্টা করছি।’
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ইমরান খানের অসুস্থতার খবর ‘কারাগার বা চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্রের সঙ্গে মেলে না’। এতে আরও বলা হয়, কারাবাস শুরুর পর থেকে ইমরান খানের ৩০ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘কারাগারের চিকিৎসক দিয়েও নিয়মিত পরীক্ষা’ করানো হয়েছে। চিকিৎসকেরা সম্প্রতি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে তাঁকে ‘স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল দেখাচ্ছে। তাঁর স্বাস্থ্যের গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো কোনো অবনতি নথিতে পাওয়া যায়নি।’
জাতিসংঘ থেকে ক্রিকেটার—অনেকের সমর্থন
ইমরান খানের মুক্তির দাবি করেছে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ওয়াশিংটন ও লন্ডনের রাজনীতিবিদেরা এবং ২১ জন সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক।
কাসিম বলেন, ‘আমরা আশা করছি, যুক্তরাজ্য এ ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন আনতে পারবে। আমাদের বাবা এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থেকেছেন এবং তিনি সব সময় ইংল্যান্ডের অনেক প্রশংসা করেছেন।’
ছেলেদের মা ও ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথ সাহায্য চেয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইমরান খান ‘তিন বছর ধরে নির্জন কারাবাস সহ্য করছেন’, যা এখন একটি ‘মানবাধিকারের জরুরি অবস্থা’য় পরিণত হয়েছে।
জেমিমা বলেন, তাঁর ছেলেরা ব্রিটিশ নাগরিক। তাঁদেরকে পাকিস্তানের ভিসা দেওয়া হয়নি। উল্টো তাঁদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাঁদের গ্রেপ্তারের ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘মানবাধিকারের জরুরি অবস্থা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
২০২২ সালের নভেম্বরে ইমরান খানের ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টার পর ছেলেরা সর্বশেষ তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
কাসিম বলেন, ‘আমাদের কিছু পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেগুলো ঠিক কী, তা আমরা প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ, আমরা জনসমক্ষে যা-ই বলি না কেন, পাকিস্তানের লোকেরা খুব দ্রুতই তা আড়ি পেতে জেনে ফেলে।’
সুলাইমান আরও বলেন, ‘এখন সবচেয়ে কঠিন সময় চলছে, পরিস্থিতি সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। তবে এখন অন্তত বিষয়টি অনেকটা মনোযোগ কেড়েছে। আমরা ভাগ্যবান যে আমাদের ভালো কিছু বন্ধু এবং একটি শক্ত পারিবারিক বন্ধন আছে, যা আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রেখেছে।’
ইমরান খান তাঁর ছেলেদের সব সময় পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে রেখেছিলেন। তাঁরা নিজেরাও কখনো ক্যামেরার সামনের জীবন চাননি।
কাসিম বলেন, বাবার স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য তিনি পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কাউকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে না দেওয়ার মধ্যে মানবিকতা কোথায়? এগুলো অত্যন্ত নীচতা, ক্ষুদ্র মানসিকতার নির্যাতনের কৌশল। তাঁকে বই দেওয়া হচ্ছে না, সন্তানদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না, ২৩ ঘণ্টা একটি নির্জন কক্ষে আটকে রাখা হচ্ছে।’
কাসিম বলেন, ‘যদি তারা অন্যায় আচরণের কোনো অভিযোগ অস্বীকার করে, তাহলে তা প্রমাণ করুক। তাঁকে একজন নিরপেক্ষ চিকিৎসক ও হাসপাতালে নিয়ে আসুক এবং চিকিৎসার প্রতিবেদনগুলো দেখাক। এটা আমাদের দুশ্চিন্তা কমাবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জনগণকে দেখাবে যে তাঁদের নির্বাচিত নেতা সুস্থ আছেন।’
অবশ্য বাবার মানসিক শক্তির ওপর এখনো বিশ্বাস রাখেন ইমরানপুত্র কাসিম। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি যতই নির্মম হোক না কেন, এই কঠিন সময়েও যদি কারও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করা যায়, তবে সেটা তিনিই।’