ইমরান খানের সঙ্গে সরকার-সেনাবাহিনীর কি কোনো সমঝোতা হচ্ছে
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশে দেশটির রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রায় তিন বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) জন্য রাজনৈতিক পরিসর তৈরির ইঙ্গিত মিলছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক ও আইনবিষয়ক কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, ইমরান খানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্যথায় এমন আদেশ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে। ইমরান খান নতুন প্রদেশ গঠন ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের মতো কোনো কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের গতি ইমরান খান ও দেশের পক্ষে যাচ্ছে। বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে শরিফ ও জারদারি পরিবারের ক্ষেত্রে।
ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সুপ্রিম কোর্টের আদেশের ঘটনায় কিছুটা বিভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পিএমএল-এন সিনেটর নাসির বাট এ ঘটনাকে নওয়াজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। এ ঘটনায় দৃশ্যত ক্ষুব্ধ বাট মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত ইমরান খানকে হাসপাতাল থেকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকার রিভিউ আবেদন করবে। ইমরান খানকে সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তাও প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারকে কি সব বন্দীকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে? যে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও তিনি গুরুতর আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মনে করছেন, ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর পর ইমরান খানকে নিয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া বিচারিক আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উচ্চতর বিচার বিভাগের ক্ষমতা অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সুপ্রিম কোর্টের আদেশের ঘটনায় কিছুটা বিভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। দলটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এই আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁদের যুক্তি, আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কেউ কেউ এটিকে ভিন্ন ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে পারেন। ধারণা করা হতে পারে, ‘কিছু মহলের’ সম্মতিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁরা বলেছেন, পিটিআইয়ের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার শেষ পরিণতি ইমরান খানের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপরনির্ভর করবে।
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তারিক মাহমুদ খোখর পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার বিচারিক নির্দেশনাকে ‘দেশ ও প্রবাসী জনগণের সম্মিলিত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
খোখর বলেন, এই ঘটনা ‘শরিফ ও জারদারি পরিবারের জন্য ভালো কোনো ইঙ্গিত নয়’। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে ‘অসাংবিধানিক শক্তি, পিএমএল-এন ও পিপিপির অশুভ ত্রিশক্তির মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক নেই’।
খোখর বলেন, এই ঘটনার পেছনে হয়তো দেরিতে হলেও এই উপলব্ধি কাজ করেছে, ‘ফরম ৪৭-এর সমাধান আসলে কোনো সমাধান নয়।’ ‘ফরম ৪৭’ পাকিস্তানের ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া একটি রাজনৈতিক পরিভাষা। তাঁর মতে, এটি পাকিস্তানকে অস্তিত্বের সংকট থেকে বের করে আনতে পারেনি। একইভাবে, এর মাধ্যমে নতুন প্রদেশও গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
খোখর মনে করেন, পাকিস্তান ও বিদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত পর্যবেক্ষকেরা পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থাকে ‘রাজনৈতিক, প্রেটোরিয়ান [সামরিক হস্তক্ষেপনির্ভর] এবং অসাংবিধানিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল’ বলে মনে করেন।
দেশটির এই সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তাঁদের সম্মতি ছাড়া এ ধরনের আদেশ দেওয়া হয়েছে—এটা কল্পনা করা কঠিন।’ তাঁর ভাষ্যমতে, বিচারিক আদেশের মাধ্যমে ইমরান খানকে আদিয়ালা কারাগার থেকে শিফা হাসপাতালে নেওয়াকে তাঁরা ‘বৈধতার আবরণ’ হিসেবে দেখছেন।
খোখর বলেন, ‘যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনের গতি ইমরান খান ও দেশের পক্ষে যাচ্ছে। বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে শরিফ ও জারদারি পরিবারের ক্ষেত্রে।’
খোখর আরও বলেন, তাঁদের ‘ক্ষমতায়ন শুরু থেকে ব্যর্থ হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল’। এখন তাঁরা ‘রাজনৈতিক, নৈতিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক—সব দিক থেকে পুরোপুরি ধরা খেয়েছেন ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।...একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এর পরিণতিতে পিটিআইকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে।’
সাবেক ফেডারেল মন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ‘সুস্থ রাজনৈতিক অগ্রগতির নতুন এক যুগের’ সূচনা করতে পারে। তাঁর মতে, এ ঘটনা এটাও ইঙ্গিত দিচ্ছে—সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা সঠিক পথে এগোচ্ছে।
খান আবদুল গফফার খান কয়েক দশক কারাগারে ছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। তাঁদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো আদর্শের শক্তি কারাবাসের মেয়াদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং মৌলিক নীতির কাছে আত্মসমর্পণ না করার মধ্যেই সেই শক্তি নিহিত থাকে।
ফাওয়াদ চৌধুরী বলেন, ‘আশা করি, এই প্রক্রিয়ায় স্টাবিলিশমেন্টের (সেনাবাহিনীর) সম্মতি থাকবে এবং এমনভাবে এর সমাপ্তি হবে, যা পাকিস্তানের জন্য কল্যাণকর।’ তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া এবং নতুন প্রদেশ গঠনসহ জটিল বিষয় নিয়ে সংলাপের পরিবেশ তৈরির গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
ফাওয়াদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘এ ধরনের সংলাপে ইমরান খানের সমর্থন অপরিহার্য।’
সাবেক আইন কর্মকর্তা ওয়াকার রানা সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আদালত মূলত সংবিধান ও নাগরিকদের সেই অধিকার সমুন্নত রেখেছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়নি।
রানা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে বের করে আনতে হলে অর্থবহ সংস্কার প্রয়োজন—এই উপলব্ধি (এরই মধ্যে) তৈরি হয়েছে।’
বর্জনের রাজনীতির অবসান ঘটানোর সময় এসেছে উল্লেখ করে রানা বলেন, ‘দেশের স্বার্থ ও সমস্যাগুলো এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি দাবি করছে, যেখানে সব শক্তি একযোগে কাজ করে পাকিস্তানকে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে।’
তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা থেকে পাকিস্তানের শেখা উচিত বলে মনে করেন রানা। তিনি বলেন, ‘এসব দেশ তাদের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন করেছে।...আমি বিশ্বাস করি, ইমরান খান তাঁর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে ভাবার যথেষ্ট সময় পেয়েছেন এবং কিছু শিক্ষা নিয়েছেন।’ তিনি বিচার বিভাগ সংস্কারেরও আহ্বান জানান।
তবে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আদেশের সমালোচনা করেছেন এবং এই বিচারিক কার্যক্রমের ব্যাপকতর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবেদনটি নিজেই ‘বিচারব্যবস্থার, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতের বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র’।
এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর প্রশ্ন, ‘অতিরিক্ত দেরির কারণেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তাহলে এর দায় কার? আজ যে বিচারকেরা বিষয়টি শুনছেন, তাঁদের কি এই বিষয়টি স্বীকার করা উচিত ছিল না?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই আইনজীবীর মতে, আদেশটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এর মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর সাংবিধানিক বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা রয়েছে।
এর অর্থ হলো, ইমরান খান কী ধরনের রাজনৈতিক কথা বলতে পারবেন বা পারবেন না, আদালতের আদেশে সে বিষয়ে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে বলে ওই আইনজীবী মনে করছেন।
ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের হলফনামা দিতে বলা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের হলফনামা দিতে বলা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এটা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তাঁরা যদি হলফনামা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে কী হবে? শুধু এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে কি সুপ্রিম কোর্ট একজন বন্দীর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হতে দেবে? নাকি রাজনৈতিক বিবেচনাকে সাংবিধানিক দায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে?’
ওই আইনজীবী বলেন, যেসব বিচারক এই আদেশ দিয়েছেন, তাঁরা সংবিধান সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও রক্ষার শপথ নিয়েছেন। এই শপথের সঙ্গে বিরাট দায়িত্বও রয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এসবের সবকিছু যদি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে। (এমনটি হয়ে থাকলে) প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে আর কী অবশিষ্ট থাকে?’
ইতিহাস তাঁদেরই মনে রাখে, যাঁরা নীতির সঙ্গে আপস না করে কারাবরণ করেছেন—এ কথা উল্লেখ করে ওই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘খান আবদুল গফফার খান কয়েক দশক কারাগারে ছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। তাঁদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো আদর্শের শক্তি কারাবাসের মেয়াদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং মৌলিক নীতির কাছে আত্মসমর্পণ না করার মধ্যেই সেই শক্তি নিহিত থাকে।’