দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়ার শেষ দিন অন্তত একটি বি–১বি বোমারু বিমান অংশ নেয়।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ মহড়ার শেষ দিন শনিবার উত্তর কোরিয়া স্বল্পপাল্লার চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

দুই মিত্র দেশের মধ্যে এ যৌথ সামরিক মহড়ার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ভিজিল্যান্ট স্টর্ম’। যৌথ মহড়ায় দুই পক্ষের প্রায় ২৪০টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই এফ–৩৫ মহড়ায় অংশ নেয়। এ মহড়া নিয়ে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে।

উত্তর কোরিয়া এ সপ্তাহে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে  সাগরে। এর মধ্যে আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রও (আইসিবিএম) ছিল। উত্তর কোরিয়ায় যুদ্ধবিমান ওড়াতেও দেখা যায়। পিয়ংইয়ং আইসিবিএম ছোড়ায় জাপানে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শুক্রবার বলেছে, ভিজিল্যান্ট স্টর্ম নামে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া যে যৌথ সামরিক মহড়া চালাচ্ছে, এর জবাব দিতেই সামরিক এ তৎপরতা চালিয়েছে তারা। ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ সামরিক মহড়াকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীন সামরিক তৎপরতার প্রদর্শন বলেছে উত্তর কোরিয়া।

পিয়ংইয়ং বলেছে, শত্রুপক্ষের সামরিক বাহিনীর যেকোনো তৎপরতা যদি উত্তর কোরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে পাল্টা সামরিক তৎপরতা চালিয়ে এর সর্বোচ্চ কঠোর জবাব দেবে তারা।

বড় পরিসরের প্রশিক্ষণ আবারও শুরু তবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে টানাপোড়েন শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষমতার প্রদর্শন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই যুক্তরাষ্ট্র বি–১বি বোমারু বিমান মহড়া চালায়। বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরের শেষে গুয়াম বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র চারটি বি-১বি মোতায়েন করে রেখেছে।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকে দক্ষিণ কোরিয়া। সাম্প্রতিক তৎপরতায় এ উদ্বেগ বেড়েছে। এ জন্য সিউল যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলে কৌশলগত সমরাস্ত্রের মোতায়েন বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এর মধ্যে আছে বিমানবাহী রণতরী, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ও বি–১বি বোমারু বিমান।

গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সঙ্গে বৈঠক করেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি জং–সুপ। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, কোরীয় উপদ্বীপ ও এর আশপাশ ঘিরে মোতায়েন কৌশলগত সমরাস্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ব্যাপারে একমত হয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সুপারসনিক বোমারু বিমান বি–১বি সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০১৭ সালে। উত্তর কোরিয়ার একের পর এক সামরিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় এ বোমারু বিমান মহড়া চালানো হয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা এবং করোনা মহামারির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় পরিসরের সামরিক মহড়া বন্ধ ছিল।

উত্তর কোরিয়া রেকর্ডসংখ্যক সমরাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোয় এ বছর থেকে মিত্র এ দুই দেশ বড় পরিসরে সামরিক মহড়া আবার শুরু করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিভাজনকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে যৌথ মহড়া চালাচ্ছে দেশ দুটি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা পরিষদের এই বিভাজন আরও প্রকট হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এ বিভাজনকে কাজে লাগাচ্ছে উত্তর কোরিয়ায়ও। এ সুযোগে পিয়ংইয়ং তাদের সমরাস্ত্র ছুড়ে সেসবের পরীক্ষা চালাচ্ছে।

উত্তর কোরিয়া মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের বি–১বি এমন একটি বোমারু বিমান, যেটি থেকে পারমাণবিক বোমা হামলা চালানো যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এই বোমারু বিমানের সংস্কার করেছে। সংস্কারের পর থেকে এ বোমারু বিমান থেকে এখন শুধু প্রচলিত অস্ত্র ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

পরিস্থিতি নাজুক

উত্তর কোরিয়ার একসঙ্গে প্রায় ১৮০টি যুদ্ধবিমানের মহড়ার পর গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৮০টি যুদ্ধবিমানের মহড়া চালায়। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ বলেন, উত্তর কোরিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে এসব যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায়। তবে যুদ্ধবিমান দুই দেশের সীমান্তের কাছাকাছি গিয়েছিল কি না, তা বলেননি।

এদিকে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকেও দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। গত শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পিয়ংইয়ংয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে একেবারে নিরস্ত্র করার একটি কৌশল নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের উসকানি দেওয়া হলে উত্তর কোরিয়া একই রকম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে উত্তর কোরিয়া ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে বলে ইঙ্গিত আসছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ক্ষমতাধর একটি দেশ হিসেবে মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করার চেষ্টা করছে পিয়ংইয়ং। দেশটি চায়, এটা মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিক ইস্যুগুলো নিয়ে সমঝোতা করতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসুক।