৫০ বছর শেষে চাঁদে পা রাখা নভোচারীরা কতটা সফল ছিলেন

চাঁদের সর্বশেষ মানুষের পা পড়েছিল ১৯৭১ সালের এই দিনে। এরপর গত অর্ধশতাব্দী আর সে পথে পা মাড়ায়নি মানুষ। তবে নতুন করে আবার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন চারজন নভোচারী। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৩০ সালে আবার চাঁদে মানুষের পা পড়তে পারে।

অ্যাপোলো –১৪ নভোযানের মহাকাশচারীরাছবি : নাসা

বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে মহাকাশ প্রতিযোগিতা এখন তীব্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপের মহাকাশ সংস্থাগুলো এখন মহাকাশ ঘিরে নতুন কৌশল সাজাচ্ছে। তাদের আকর্ষণের কেন্দ্র এখন চাঁদ। ৫০ বছর ধরে চাঁদের মাটিতে নভোচারী না পাঠানো চীন ও  যুক্তরাষ্ট্র এখন সেখানে নভোচারী পাঠাতে তৎপর।

ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। ৫০ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো চাঁদে নভোচারী পাঠাতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সংস্থাটির ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের আওতায় এই অভিযানে নভোচারীরা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

এর মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণায় মানুষ আগের চেয়ে আরও দূর সীমানায় পা রাখতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৮ ফেব্রুয়ারি এই ঐতিহাসিক মিশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে উৎক্ষেপণপ্রক্রিয়াটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।

আর্টেমিস হলো নাসার একটি চন্দ্র অভিযান কর্মসূচি। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো মিশনের পর আর কোনো মানুষ চাঁদে যায়নি। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো আবারও মানুষকে চাঁদে ফিরিয়ে নেওয়া।

তবে কেবল চাঁদে যাওয়াই লক্ষ্য নয়, নাসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো সেখানে ‘লুনার গেটওয়ে’ নামে একটি মহাকাশ স্টেশন তৈরি করা। যেখানে নভোচারীরা অবস্থান করে কাজ করতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবেন।

চাঁদে ফিরছেন মানুষ

নাসা জানিয়েছে, নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে চার নভোচারী খুব শিগগির পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ পেরিয়ে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করতে যাচ্ছেন। গভীর মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ঝালিয়ে নিতেই এই বিশেষ মিশন।

২০২৩ সালের জুন মাস থেকে এই চন্দ্র অভিযানের জন্য জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন নাসার তিন নভোচারী—রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডীয় মহাকাশ সংস্থার (সিএসএ) জেরেমি হ্যানসেন।

প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে ‘ইন্টিগ্রিটি’ নামের ওরিয়ন মহাকাশযান এবং এসএলএস রকেটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করবেন তাঁরা। পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় এই চার অভিযাত্রীকে অনেক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহাকাশযান পরিচালনা করতে হবে এবং বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি অ্যাপোলো ১৪ কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়
ছবি : নাসা

এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে ‘আর্টেমিস-১’ মিশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সে সময় একটি খালি ওরিয়ন ক্যাপসুল চাঁদ প্রদক্ষিণ করে নাসার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছিল।

সত্তরের দশকে মহাকাশ গবেষণায় বরাদ্দ কমে যাওয়ার পর এই কর্মসূচিকে চাঁদের প্রতি মানুষের নতুন করে আগ্রহের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

চাঁদে যাওয়ার ইতিহাস

মানুষ প্রথম চাঁদে যায় ১৯৬৯ সালে। অ্যাপোলো-১১ মিশন থেকে চাঁদের পৃষ্ঠে পা ফেলে নিল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, মানুষের জন্য এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিরাট ঘটনা।

বিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের পর প্রায় তিন বছর ধরে পৃথিবীর এই উপগ্রহটিতে অবতরণ করেছে মনুষ্যবাহী ছটি মিশন, চাঁদের পিঠে হেঁটেছেন মোট ১২ জন নভোচারী। এ সময় তাঁরা ছবি তুলেছেন, পতাকা গেড়েছেন, পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং চাঁদের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁরা ৩৮০ কেজির মতো নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন।

সবশেষ মিশনটি পাঠানো হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন ভাবা হয়েছিল, ভবিষ্যতে মানুষ ঘন ঘন চাঁদে যাবে এবং উপগ্রহটি মহাকাশ গবেষণায় নিয়মিত এক গন্তব্যে পরিণত হবে। কিন্তু সে রকম হয়নি।

১৯৭২ সালের ওই মনুষ্য মিশনই ছিল শেষ অভিযান এবং চাঁদে পৃথিবীর শেষ অতিথি ছিলেন নভোচারী ইউজিন সারনান। তারপর গত অর্ধশতাব্দী ধরে আর কেউ চাঁদে অবতরণ করেননি।

চাঁদের মাটিতে পরীক্ষা চালাচ্ছেন অ্যালান শেপার্ড
ছবি : নাসা

অ্যাপোলো–১৪

বিবিসি স্কাই অ্যাট নাইট ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মিশন ছিল অ্যাপোলো–১৪। ঠিক ৫০ বছর আগে এক অনিশ্চিত সময়ে শুরু হয়েছিল ‘অ্যাপোলো-১৪’ মিশন। নাসার এই চন্দ্র অভিযান যখন শুরু হয়, তখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রে এই কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমছিল, আর নীতিনির্ধারকেরা ভাবছিলেন বিপুল খরচের কথা। ঠিক এই সংকটকালেই ৩১ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় অ্যাপোলো-১৪।

অ্যাপোলো-১৩-এর যান্ত্রিক ত্রুটি আর রোমহর্ষ উদ্ধার অভিযান মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যাপোলো-১৮ ও ১৯ মিশন বাতিল করা হয়। ফলে এই কর্মসূচির টিকে থাকা নির্ভর করছিল অ্যাপোলো-১৪-এর সাফল্যের ওপর। অথচ এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নাসার সবচেয়ে অনভিজ্ঞ একটি দলকে।

অভিযানের কমান্ডার ছিলেন কিংবদন্তি অ্যালান শেপার্ড। ১৯৬১ সালে প্রথম মার্কিন হিসেবে মহাকাশে গিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন। তবে কানের সমস্যার কারণে দীর্ঘ এক দশক তাঁকে মাটিতেই কাটাতে হয়।

শেপার্ডের সঙ্গী হিসেবে ছিলেন স্টুয়ার্ট রুসা ও এডগার মিচেল—যাঁদের আগে মহাকাশে ওড়ার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। সব মিলিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটের মহাকাশযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা নেমেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল বৈজ্ঞানিক মিশনে।

লক্ষ্য ছিল চাঁদের রহস্য উদ্‌ঘাটন

এই মিশনের অবতরণস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ‘ফ্রা মাউরো’ অঞ্চলকে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, এখানে মিলবে চাঁদের গভীর স্তরের শিলা, যা দিয়ে চাঁদের জন্মের সঠিক সময় বের করা সম্ভব হবে। তবে কমান্ডার অ্যালান শেপার্ডের এ নিয়ে খুব একটা উৎসাহ ছিল না। শিলা শনাক্ত করার সংক্ষিপ্ত কোর্স করলেও ভূতত্ত্বের চেয়ে অভিযান পরিচালনাতেই তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি।

আর্টেমিস অভিযানে আবার চাঁদের কক্ষপথে যাচ্ছেন চার নভোচারী
ছবি : নাসা

উৎক্ষেপণের দিনই বাদ সাধে আবহাওয়া। ৪০ মিনিট দেরিতে যাত্রা শুরু হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবারও বিপদ দেখা দেয়। কমান্ড মডিউলের সঙ্গে ল্যান্ডার ‘অ্যান্টারেস’–কে যুক্ত করতে গিয়ে ব্যর্থ হন রুসা। পাঁচবার চেষ্টার পর অনেকটা গায়ের জোরে মহাকাশযান দুটিকে জোড়া লাগানো হয়।

শেষ পর্যন্ত ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে চাঁদে পা রাখেন শেপার্ড ও মিচেল। চাঁদের বুকে নেমে তাঁরা যন্ত্রপাতি বসানো শুরু করেন। এবারের অন্যতম নতুন পরীক্ষা ছিল ‘থাম্পার’ বা কম্পন সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে চাঁদের ভেতরের গঠন বোঝার চেষ্টা করা হয়।

রিকশা নিয়ে পাহাড়ের খোঁজে

পরদিন শুরু হয় ‘ক্র্যাটার কোন’ বা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের সন্ধানে দীর্ঘ পদযাত্রা। সঙ্গে ছিল যন্ত্রাংশ টানার জন্য দুই চাকার একটি গাড়ি, যাকে নভোচারীরা ডাকতেন ‘রিকশা’ নামে। চাঁদের বন্ধুর পথ আর প্রখর সূর্যালোক তাঁদের বিভ্রান্ত করছিল।

দীর্ঘ সময় হাঁটার পর ক্লান্ত হয়ে যখন নভোচারীরা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁরা জানতেনও না যে লক্ষ্যবস্তু থেকে মাত্র ২০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁরা। ফিরে আসার আগে কমান্ডার শেপার্ড সবাইকে চমকে দেন। লুকিয়ে আনা একটি গলফ ক্লাবের মাথায় খননযন্ত্র লাগিয়ে তিনি চাঁদের বুকে গলফ খেলা শুরু করেন।

মিশন শেষে পৃথিবীতে ফেরার পর নভোচারী এডগার মিচেল যখন দাবি করেন, তিনি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে টেলিপ্যাথি বা মনের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর পরীক্ষা চালিয়েছেন, তখন বিতর্ক আরও বৃদ্ধি পায়।

ইতিহাসের পাতায় অ্যাপোলো-১৪ শেপার্ডের সেই গলফ খেলার জন্য অমর হয়ে থাকলেও, নাসার অনেক বিজ্ঞানীর কাছে এটি ছিল একটি আক্ষেপের নাম। তাঁদের মতে, বিজ্ঞানের অনেক বড় সুযোগ নষ্ট হয়েছিল অপেশাদার কিছু আচরণের কারণে। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে এই মিশনই প্রমাণ করেছিল—মানুষ আবারও চাঁদে ফেরার জন্য প্রস্তুত।

তথ্যসূত্র : নাসা, স্কাই নিউজ, বিবিসি