দেশে-দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা-৫
নিউজিল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতারণার ইতিহাস
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্বাধীনতার ধারণা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন নিউজিল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যিক কূটনীতির এক জটিল প্রতিচ্ছবি। এই ঘোষণাপত্রের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে ছিল আদিবাসী স্বায়ত্তশাসনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের এক সুকৌশলী কূটনৈতিক চাল।
বিশ্ব–ইতিহাসে, বিশেষ করে আদিবাসী অধিকার এবং ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের বিবর্তনের ইতিহাসে ১৮৩৫ সালের ২৮ অক্টোবর এক অবিস্মরণীয় দিন। এদিন নিউজিল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের মাওরি আদিবাসীদের প্রধান নেতারা ‘ওয়েতাঙ্গি’ নামক স্থানে একত্র হয়ে একটি ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এটি কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের সাধারণ কোনো ঘোষণাপত্র ছিল না; বরং এর প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে ছিল আদিবাসী স্বায়ত্তশাসনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যদিকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের এক সুকৌশলী কূটনৈতিক চাল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্বাধীনতার ধারণা ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন নিউজিল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যিক কূটনীতির এক জটিল প্রতিচ্ছবি। ঘোষণাপত্রের একেবারে শুরুতেই মাওরি নেতারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে নিজেদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ঘোষণাপত্রের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘আমরা, নিউজিল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের উপজাতিদের বংশানুক্রমিক প্রধান ও নেতারা... আমাদের দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি, যা এতদ্বারা “নিউজিল্যান্ডের সম্মিলিত উপজাতি” নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত ও ঘোষিত হলো।’
নিউজিল্যান্ডের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যিক কূটনীতির এক জটিল প্রতিচ্ছবি। ঘোষণাপত্রের একেবারে শুরুতেই মাওরি নেতারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে নিজেদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
এই বলিষ্ঠ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল। ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে টিকে থাকতে হলে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা গঠন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট ঘোষণা
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা ঠিক কাদের হাতে থাকবে, তা ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে: ‘এতদ্বারা ঘোষণা করা হচ্ছে যে, নিউজিল্যান্ডের সম্মিলিত উপজাতিদের ভূখণ্ডের অন্তর্গত সমস্ত সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ এবং এককভাবে উপজাতিদের বংশানুক্রমিক প্রধান ও নেতাদের সম্মিলিত সত্তার ওপর ন্যস্ত থাকবে।’
তাঁরা দৃঢ়তার সঙ্গে আরও ঘোষণা করেন যে তাঁদের নিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া বহিরাগত অন্য কাউকে সেখানে আইন প্রণয়নের অধিকার বা সরকারের কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেওয়া হবে না।
আপাতদৃষ্টিতে এই ঘোষণাটিকে মাওরিদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক জাগরণ মনে হলেও এর মূল কারিগর ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। তৎকালীন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জেমস বাসবি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফরাসিদের আধিপত্য বিস্তারের আশঙ্কায় অত্যন্ত সুকৌশলে এই ঘোষণাপত্রটির নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছিলেন। মাওরিদের প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল না, বরং ব্রিটিশদের উপনিবেশ স্থাপনের আইনি পথ সুগম করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
কীভাবে এই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, তার একটি চমৎকার রূপরেখা তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘ন্যায়বিচার প্রদান, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে উপজাতিদের বংশানুক্রমিক প্রধান ও নেতারা প্রতিবছরের শরৎকালে ওয়েতাঙ্গিতে একটি কংগ্রেসে বা মহাসভায় মিলিত হতে সম্মত হয়েছেন।’
শুধু তাই নয়, তারা একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য দক্ষিণাঞ্চলের উপজাতিদেরও উদারভাবে আহ্বান জানান, যাতে শত শত বছর ধরে নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত থাকা বিচ্ছিন্ন উপজাতিগুলোকে একত্র করে একটি অখণ্ড জাতিরাষ্ট্র গঠন করা যায়।
সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশল
আপাতদৃষ্টিতে এই ঘোষণাটিকে মাওরিদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক জাগরণ মনে হলেও এর মূল কারিগর ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। তৎকালীন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জেমস বাসবি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফরাসিদের আধিপত্য বিস্তারের আশঙ্কায় অত্যন্ত সুকৌশলে এই ঘোষণাপত্রটির নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছিলেন। মাওরিদের প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল না, বরং ব্রিটিশদের উপনিবেশ স্থাপনের আইনি পথ সুগম করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। বাসবির নিজস্ব একটি চিঠিতেই এই ভয়ানক চক্রান্তের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
বাসবি লিখেছিলেন: ‘ব্রিটিশ সরকারের সুরক্ষায় স্বাধীন নিউজিল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করাটাই হবে এই দেশটিকে সব দিক থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি উপনিবেশ বা নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
ব্রিটিশদের এই সুকৌশলী আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি ঘোষণাপত্রের চতুর্থ অনুচ্ছেদে প্রকট হয়ে ওঠে। সেখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত অসহায়ভাবে ব্রিটিশ রাজার কাছে সুরক্ষার আবেদন জানানো হয়:
‘তাঁরা এই ঘোষণাপত্রের একটি অনুলিপি ইংল্যান্ডের মহামান্য রাজার কাছে পাঠাতেও সম্মত হয়েছেন... তাঁরা বিনীত অনুরোধ করছেন যে তিনি যেন তাঁদের এই শিশু-রাষ্ট্রের পিতা হিসেবে অব্যাহত থাকেন এবং এর স্বাধীনতার ওপর সব রকম আগ্রাসন থেকে এর রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।’
ওয়েতাঙ্গি চুক্তি (১৮৪০) এবং অনুবাদের সুপরিকল্পিত প্রতারণা
এই সাজানো স্বাধীনতার মোহভঙ্গ হতে মাওরিদের খুব বেশি দিন সময় লাগেনি। ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে, ১৮৩৫ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার কারণে মাওরিদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ শাসনভার নেওয়া বা আইনিভাবে দেশ দখল করা সম্ভব নয়। এই আইনি বাধা দূর করতে মাত্র পাঁচ বছর পর, ১৮৪০ সালে ব্রিটিশরা মাওরিদের সঙ্গে কুখ্যাত ‘ওয়েতাঙ্গি চুক্তি’ (Treaty of Waitangi) স্বাক্ষর করে।
ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে ১৮৩৫ সালের স্বাধীনতার ঘোষণার কারণে মাওরিদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ শাসনভার নেওয়া বা আইনিভাবে দেশ দখল করা সম্ভব নয়। এই আইনি বাধা দূর করতে মাত্র পাঁচ বছর পর, ১৮৪০ সালে ব্রিটিশরা মাওরিদের সঙ্গে কুখ্যাত ‘ওয়েতাঙ্গি চুক্তি’ স্বাক্ষর করে।
এই চুক্তির পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল ভাষাগত ও আইনি প্রতারণা। চুক্তির ইংরেজি সংস্করণে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে মাওরিরা তাদের ভূখণ্ডের সব ‘সার্বভৌমত্ব’ (Sovereignty) চিরতরে ব্রিটিশ মুকুটের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু চুক্তির যে মাওরি ভাষার সংস্করণটিতে (Te Tiriti) মাওরি নেতারা স্বাক্ষর করেছিলেন, সেখানে অত্যন্ত সুকৌশলে ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
মাওরি সংস্করণে বলা হয়েছিল, মাওরিরা ব্রিটিশদের কেবল দেশ পরিচালনার বা ‘শাসনভার’ (Kāwanatanga বা Governance) দিচ্ছে। এর বিনিময়ে চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে মাওরিদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে তাদের নিজস্ব জমি, বন এবং সম্পদের ওপর তাদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্ব (Tino rangatiratanga) অক্ষুণ্ণ থাকবে। সহজ কথায়, মাওরিরা সরল বিশ্বাসে ভেবেছিল তারা শুধু আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব ব্রিটিশদের দিচ্ছে এবং নিজেদের স্বাধীনতা ধরে রাখছে; কিন্তু ব্রিটিশরা ইংরেজি চুক্তির দোহাই দিয়ে পুরো দেশের মালিকানা দাবি করে বসে।
মোহভঙ্গ ও বিদ্রোহ
এই চরম ভাষাগত ও আইনি প্রতারণা বুঝতে পেরে দ্রুতই আদিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠে। ১৮৪৪ সালে হোনে হেকে নামের একজন অত্যন্ত সাহসী মাওরি নেতা ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ১৮৩৫ সালে তাঁদের যে তথাকথিত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল এবং ১৮৪০ সালে যে চুক্তি করানো হয়েছিল—দুটিই ছিল দাসত্বের সুপরিকল্পিত শৃঙ্খল।
তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের প্রতীক একটি পতাকাদণ্ডে একাধিকবার কুঠার দিয়ে আঘাত হানেন এবং তা ধ্বংস করে দেন। আমেরিকানরা যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, সেই আদর্শ এই নেতাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
উপসংহার
জেমস বাসবির মতো সাম্রাজ্যবাদী এজেন্টরা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল পরানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে ওয়েতাঙ্গি চুক্তির অনুবাদের ফাঁদে ফেলে সেই অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে এই ধারাবাহিক অবিচারই পরবর্তী সময়ে মাওরিদের মধ্যে তীব্র অধিকার সচেতনতা তৈরি করে, যা আজও বিশ্ব-ইতিহাসে আদিবাসী অধিকার আদায়ের এক অনন্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।