ইঞ্জিনিয়ারড আর্টস মূলত ইংল্যান্ডের ফলমাউথ এলাকার ছোট রোবটিক প্রতিষ্ঠান। তারা অ্যামেকা রোবটের বেশ কিছু ত্রুটি সারাতে কাজ করছে। বিশেষ করে রোবটের চোখে বসানো ক্যামেরার আরও উন্নতি করছে তারা। এ ক্যামেরার সফটওয়্যার এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা মানুষের চেহারা চিনতে পারে। এমনকি কে চোখের দিকে তাকাচ্ছে এবং গুরুত্ব দিয়ে কথা বলছে, তা-ও বুঝতে পারে।

সাধারণত রোবটকে মানুষের মতো আচরণ করতে শেখানো, বিশেষ করে যাতে নিরাপদে এগুলো মানুষের পাশাপাশি কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে অ্যামেকাসহ এ ধরনের অত্যাধুনিক কিছু রোবটের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি দেখা গেছে।

মানবসদৃশ রোবট তৈরিতে এখন বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্বের শীর্ষ ধনী, টেসলা ও টুইটারের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক অপটিমাস নামের একটি রোবট উদ্বোধন করেন। ইলন মাস্কের রোবটটি দর্শকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে এর দক্ষতা দেখায়। অপটিমাস নামের রোবটটি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। পরে টেসলার তৈরি আরও উন্নত একটি রোবট প্রদর্শন করা হয়। চাকা লাগানো এ রোবট এখনো হাঁটতে পারে না। তবে ইলন মাস্ক বলেছেন, রোবটের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে। উন্নত রোবট ব্যাপক হারে তৈরি করা হবে। এর দাম এসে দাঁড়াবে ২০ হাজার মার্কিন ডলারে।

ঘরে ঘরে রোবট

ইলন মাস্ক যে রোবট তৈরির কথা বলেছেন, তার দাম অ্যামেকার চেয়ে অনেক কম। মাস্কের অপটিমাস রোবট উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন জ্যাকসন। তিনি বলেন, ব্যাপক হারে উৎপাদন শুরু হলে রোবটের দাম কমে আসবে। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠান ১১টি অ্যামেকা রোবট বিক্রি করেছে। শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামেকা রোবট তৈরির কারখানা চালু করা হবে।

তবে ইলন মাস্কের প্রস্তাব নিয়ে জ্যাকসন বিস্ময় প্রকাশ করেন। কারণ, মাস্ক যে ধরনের রোবট তৈরির কথা বলেছেন, তার কয়েকটি মানবসদৃশ নয়। কারখানার উপযোগী করে তৈরি করা বিভিন্ন রোবট এখন যন্ত্রপাতি পরিবহন, ওয়েল্ডিং, রং করা, গাড়ি জোড়া লাগানোর মতো কাজ করে থাকে। তাই এসব রোবটকে মানবসদৃশ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

জ্যাকসনের মতে, মানবসদৃশ রোবট তৈরির পেছনে মানুষের যোগাযোগের বিষয়টি জড়িত। অ্যামেকাকে আরেকটু উন্নত করা হলে এটি বয়স্ক মানুষের সঙ্গী হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এটি বৃদ্ধ মানুষকে দেখে রাখা, তাকে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য দেওয়া, কোনো বিষয় ভুলে গেলে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো নানা কাজ করতে পারবে। এ ছাড়া অ্যামেকাকে দাবা খেলার মতো বিভিন্ন খেলাও শেখানো হচ্ছে। তবে অ্যামেকাকে এমনভাবে শেখানো হচ্ছে, যাতে মাঝেমধ্যে তাকে হারানোও সম্ভব হতে পারে।

মানুষের সঙ্গে ঠিকভাবে যোগাযোগ রাখতে রোবটকে মানুষের মতো হওয়া উচিত বলেই মনে করেন জ্যাকসন। তাঁর মতে, মানুষের চেহারা যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় কথা বলার চেয়ে মুখভঙ্গিতেই অনেক কিছু বোঝানো হয়ে যায়। তাঁরা তাই অ্যামেকার চেহারা এমনভাবে তৈরি করেছেন, যাতে বোধগম্য মুখভঙ্গি করতে পারে এ রোবট।

অ্যামেকার মানবসদৃশ রূপ ছাড়াও একে কারও অ্যাভাটারের রূপ দেওয়া যায়। এ ছাড়া কথোপকথন চালানোর সময় যাতে তা রোবোটিক না হয়, এ কারণে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ নামের বিশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা হয়। এটি ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে চালানো যায়। এখন পর্যন্ত অবশ্য অ্যামেকা হাঁটতে পারে না। ইঞ্জিনিয়ারড আর্টসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ রোবটের কম্পিউটার ভিশন বা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করার পাশাপাশি এর চলাফেরার জন্য পা যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।

কারা আছে রোবট ব্যবসায়

রোবটিক ক্ষেত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ইঞ্জিনিয়ারড আর্টসের মতো প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, তেমনি টেসলার মতো বড় প্রতিষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান সহজে সফলতা পায়নি।

জাপানের গাড়ি নির্মাতা হোন্ডা কাজ শুরু করেছিল আসিমো নামের রোবট নিয়ে। আশির দশক থেকে তারা এ নিয়ে কাজ করে আসিমোর নানা উন্নয়ন করে। তবে ২০১৮ সালে রোবটকে আরও জীবনঘনিষ্ঠ করতে তারা আসিমো প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। এখন তারা বয়স্কদের উপযোগী নানা রোবট নিয়ে কাজ করছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান শখকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। লন্ডনের শ্যাডো রোবট তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। তারা রোবটের হাত তৈরিতে কাজ করে। এর বাইরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে শুরু হওয়া বোস্টন ডায়নামিকস বিভিন্ন রোবট প্রকল্পে কাজ করছে। হাল্কের মতো দেখতে অ্যাটলাস নামের একটি রোবট ইতিমধ্যে ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি দৌড়াতে, লাফাতে, উল্টা ঘুরতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি স্পট নামের কুকুরসদৃশ একটি রোবট তৈরিতেও কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের অ্যাজিরিট রোবোটিকস অব করভালিস তৈরি করেছে ডিজিট নামের রোবট। যেসব স্থানে মানুষ যেতে পারে না, সেসব জায়গায় এ রোবট সহজে যেতে পারে। মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এটি করতে পারে। এতে মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা কমে। ২০২৪ সাল নাগাদ এ ধরনের রোবট আরও বেশি করে তৈরির পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে মানুষের সঙ্গে সফলভাবে যোগাযোগের জন্য রোবটের নিরাপত্তার দিকটিও দেখতে হবে। বর্তমানে রোবটের নিরাপত্তার দিকটি প্রধানত মান নিরাপত্তা এবং পণ্য-দায়বদ্ধতা নিয়মের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোবটের জন্য বা নিরাপদে রোবট পরিচালনার জন্য বিশেষ আইনের দরকার

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন মো. মিন্টু হোসেন